আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:৩২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৪ বার
অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে ‘বিশাল নেটওয়ার্ক’ পরিচালনাকারী কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইন-এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
এপস্টাইনই তাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন—অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই গুজবও তিনি সরাসরি নাকচ করেছেন।
এসব অভিযোগকে তিনি তার সুনাম ক্ষুণ্ণের উদ্দেশ্যে চালানো মানহানিকর প্রচেষ্টা বলে মন্তব্য করেন।
বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তাকে ও এপস্টাইনকে জড়িয়ে যেসব দাবি ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো ‘আজই বন্ধ হওয়া উচিত’।
এপস্টাইনের যৌন পাচারের শিকারদের জন্য শুনানির আহ্বানও জানান তিনি।
মেলানিয়া ট্রাম্প বলেন, তিনি কখনোই এপস্টাইনের শিকার হননি।
২০০০ সালে তার সঙ্গে এপস্টাইনের কেবল সংক্ষিপ্তভাবে ‘দেখা হয়েছিল’।
তিনি বলেন, ‘এপস্টাইন তার শিকারদের ওপর যে নির্যাতন চালাতেন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।
আমি কোনোভাবেই এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না—আমি অংশগ্রহণকারীও ছিলাম না।’
এপস্টাইনের সহযোগী হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল-কেও তিনি চেনেন না বলে দাবি করেন।
এপস্টাইন সংক্রান্ত নথিতে প্রকাশিত ২০০২ সালের একটি ইমেলে তার ও ম্যাক্সওয়েলের কথোপকথনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটি ছিল ‘সাধারণ যোগাযোগ’ এবং একটি ‘ভদ্রোচিত উত্তর’ মাত্র।
উল্লেখিত ইমেলটি ‘জি’ (সম্ভবত ঘিসলেইন) সম্বোধনে লেখা। সেখানে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ‘জে.ই’ (জেফরি এপস্টাইন)-এর সঙ্গে জি-এর একটি ছবির প্রশংসা করা হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, পাম বিচে যাওয়ার জন্য তিনি আর ‘অপেক্ষা করতে পারছেন না’।
ইমেলটিতে বলা হয়েছিল ‘নিউইয়র্কে ফিরে এলে আমাকে ফোন দিও। খুব ভালো সময় কাটাও! ভালোবাসা, মেলানিয়া।’
নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ওই প্রতিবেদনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি উদ্ধৃতিও ছিল, যেখানে তিনি এপস্টাইনকে ‘দুর্দান্ত মানুষ’ এবং ‘তার সঙ্গে সময় কাটানো মজার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
সেখানে ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়, ‘শোনা যায়, সে আমার মতোই সুন্দরী নারী পছন্দ করে—যাদের অনেকেই কমবয়সী। এতে কোনো সন্দেহ নেই—জেফরি তার সামাজিক জীবন উপভোগ করে।’
মেলানিয়া ট্রাম্প আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এই ভুক্তভোগীদের কংগ্রেসের সামনে শপথবদ্ধ সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক নারীরই উচিত—যদি সে চায়—জনসমক্ষে নিজের গল্প বলার সুযোগ পাওয়া। এরপর সেই সাক্ষ্য কংগ্রেসের নথিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। তবেই আমরা সত্য জানতে পারব।’
মেলানিয়া ট্রাম্প আরও বলেন, এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
তার ভাষায়, ‘এটি অপরাধ প্রমাণ করে না—তবে সত্য উদঘাটনের জন্য আমাদের স্বচ্ছ ও উন্মুক্তভাবে কাজ করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি মেলানিয়া।
তার বক্তব্যের পরপরই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হাউস ওভারসাইট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া বলেন, ‘আমরা ফার্স্ট লেডির প্রকাশ্য শুনানির আহ্বানের সঙ্গে একমত।’
তিনি কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান প্রতিনিধি জেমস কোমার-কে দ্রুত একটি প্রকাশ্য শুনানির তারিখ নির্ধারণের আহ্বান জানান।
বিবিসি রেডিও ৪-এর অনুষ্ঠানে একজন এপিস্টাইন সারভাইভার (উদ্ধার হওয়া) লিসা ফিলিপস বলেন, ফার্স্ট লেডির এই পদক্ষেপ তাকে বিস্মিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই—দেখা যাক তিনি কী করতে পারেন। হয়তো তাকে কিছুটা চাপেও রাখা উচিত।’
ফিলিপস জানান, সারভাইভাররা ইতিমধ্যেই ক্যাপিটলে গিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রকাশ্য শুনানির বদলে ‘ব্যক্তিগত সাক্ষ্য শুনানি’ আরও কার্যকর হতে পারে—কারণ অনেক সারভাইভার গোপনীয়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বা নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান।
তিনি ফার্স্ট লেডির প্রতি আহ্বান জানান সারভাইভারদের সহায়তা করতে এবং প্রমাণ করতে যে তার বক্তব্য কেবল ‘রাজনৈতিক নাটক’ নয়।
এপস্টাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া জিওফ্রে-এর পরিবার—স্কাই ও আমান্ডা রবার্টসসহ অন্যান্য সারভাইভার— বিবিসি নিউজনাইটকে জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যেই ‘সামনে এসে রিপোর্ট জমা দিয়ে এবং সাক্ষ্য দিয়ে অসাধারণ সাহস দেখিয়েছেন।’
এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘এখন তাদের কাছে আরও কিছু চাওয়া মানে দায়িত্ব এড়ানো—বিচার নয়।’
তারা ফার্স্ট লেডির বিরুদ্ধে ক্ষমতাবানদের রক্ষা করার অভিযোগ তোলেন, যার মধ্যে তার স্বামীর প্রশাসনের সদস্যরাও রয়েছেন—যারা এখনও এপস্টাইন সংক্রান্ত সব তদন্ত নথি প্রকাশ করেননি বলে তাদের দাবি।
তাদের বক্তব্য, ‘সারভাইভাররা তাদের কাজ করেছে। এখন ক্ষমতাবানদের দায়িত্ব পালনের সময়।’
ফার্স্ট লেডি ও এপস্টাইনের সম্পর্ক নিয়ে এর আগেও আইনি লড়াই হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে হারপারকলিন্স ইউকে (HarperCollins UK) একটি বই থেকে কিছু অংশ প্রত্যাহার করে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রীর পরিচয় এপস্টাইনের মাধ্যমে হয়েছিল।
একইভাবে দ্য ডেইলি বিস্ট একটি প্রতিবেদন প্রত্যাহার করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে, যা পরবর্তীতে তাদের নিজস্ব মানদণ্ড পূরণ করেনি বলে জানানো হয়।
ফার্স্ট লেডি লেখক মাইকেল উলফ-এর সঙ্গেও আইনি বিরোধে জড়ান। উলফের বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি-তে দাবি করা হয়েছিল, এপস্টাইনের সঙ্গে যুক্ত এক মডেলিং এজেন্টের মাধ্যমে মেলানিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের পরিচয় হয়।
মেলানিয়া ১ বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলার হুমকি দিলে মাইকেল উলফ পাল্টা মামলা করেন।
বৃহস্পতিবার মেলানিয়া বলেন, ‘আমার আইনজীবীরা এবং আমি এই ভিত্তিহীন মিথ্যার বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়েছি—এবং আমার সুনাম রক্ষায় কোনো দ্বিধা করব না।’
হোয়াইট হাউসে তার এই উপস্থিতি ছিল বিরল। তার স্বামী ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তিনি তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকলেও প্রভাব বজায় রেখেছেন।
ফার্স্ট লেডির এই বক্তব্য এপস্টাইন মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ নিয়ে চলমান জনবিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় এপস্টাইনকে চিনতেন বলে স্বীকার করলেও পরে দাবি করেন, তাকে পাম বিচের মার-এ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি ছিলেন ‘একজন ক্রিপ’ (অদ্ভুত ও বিরক্তিকর ব্যক্তি)।
এপস্টাইন সংক্রান্ত নথিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও বহুবার উল্লেখ থাকলেও সেখানে কোনো অন্যায়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
সূত্র: বিবিসি