ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

তেল কোম্পানির অতি মুনাফা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫৬ বার


তেল কোম্পানির অতি মুনাফা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম মাসেই বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত মুনাফা করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের জন্য করা এক বিশেষ বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

 

এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিপুল মুনাফার বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরামকো, গাজপ্রম এবং এক্সনমোবিল। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিরোধিতাকারী শক্তিগুলোই আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।

 

সংঘাতের কারণে মার্চ মাসে তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছে যায় (৭৪ পাউন্ড)। এতে ওই এক মাসেই কোম্পানিগুলোর আনুমানিক অতিরিক্ত মুনাফা দাঁড়ায় ২৩ বিলিয়ন ডলার।

যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তেল ও গ্যাস সরবরাহে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে বছর শেষে এসব কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা দাঁড়াতে পারে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার।

 

এই বিশ্লেষণে ব্যবহৃত তথ্য এসেছে জ্বালানি তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জি থেকে, যা গ্লোবাল উইটনেস বিশ্লেষণ করেছে।

এই অতিরিক্ত মুনাফার মূল বোঝা পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। মানুষকে গাড়ির জ্বালানি নিতে বেশি খরচ করতে হচ্ছে, বাড়ির বিদ্যুৎ চালাতে বেশি বিল দিতে হচ্ছে, ব্যবসাগুলোকেও বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করতে হচ্ছে। অনেক দেশ ভোক্তাদের সহায়তা দিতে জ্বালানির ওপর কর কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি, ব্রাজিল ও জাম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে সরকারি সেবার জন্য রাজস্ব কমে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর এই ‘যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত মুনাফা’র ওপর কর আরোপের দাবি জোরালো হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়ার অর্থমন্ত্রীদের পাঠানো এক অনুরোধ বিবেচনা করছে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘যারা যুদ্ধের পরিণতি থেকে লাভবান হচ্ছে, তাদের অবশ্যই সাধারণ মানুষের বোঝা কমাতে ভূমিকা রাখতে হবে।’

৪ এপ্রিল পাঠানো ওই চিঠিতে মন্ত্রীরা বলেন, এই ধরনের কর আরোপ করলে সাময়িকভাবে ভোক্তাদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে এবং সরকারি বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যয় ইতোমধ্যে ২২ বিলিয়ন ইউরো বেড়েছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সৌদি আরামকো। যদি তেলের দাম ১০০ ডলার থাকে তবে কোম্পানিটি ২০২৬ সালে ২৫.৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। এটি তাদের নিয়মিত বিপুল মুনাফার অতিরিক্ত। ২০১৬ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২৫০ মিলিয়ন ডলার লাভ করেছে কোম্পানিটি। দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগকে বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

রাশিয়ার তিন কোম্পানি—গাজপ্রম, রসনেফট এবং লুকঅয়েল মিলে বছর শেষে প্রায় ২৩.৯ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। মার্চ মাসে রাশিয়া দৈনিক ৮৪০ মিলিয়ন ডলার তেল রপ্তানি থেকে আয় করেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই মুনাফায় ইউক্রেন যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের অর্থভান্ডার আরও শক্তিশালী হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু অস্বীকারের ইতিহাস রয়েছে এক্সনমোবিল কোম্পানির। এই কোম্পানি ২০২৬ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। শেল পেতে পারে ৬.৮ বিলিয়ন ডলার। শেয়ারমূল্য বৃদ্ধির কারণে এই কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্যও বেড়েছে। এক্সনমোবিলের মূল্য ১১৮ বিলিয়ন ডলার এবং শেলের ৩৪ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

শেভরন প্রায় ৯.২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থ জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ১০৪ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল এটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল সতর্ক করে বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এর বদলে বাড়তি খরচ ও নির্ভরশীলতা তৈরি করছে।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই সমস্যা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সূর্যালোক কোনো সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভর করে না।’

ইরান যুদ্ধের এই অতিরিক্ত মুনাফা নতুন কিছু নয়। গত অর্ধশতাব্দী ধরে তেল-গ্যাস খাত গড়ে বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে, বিশেষ করে ২০২২ সালের মতো সংকটময় সময়ে আরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এই খাত সরাসরি ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ভর্তুকিও পেয়েছে।

গ্লোবাল উইটনেসের তদন্ত প্রধান প্যাট্রিক গ্যালি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সংকট বারবার বড় তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে, আর এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। যতদিন সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে না, ততদিন আমাদের ব্যয়ক্ষমতা ক্ষমতাবানদের খেয়ালের ওপর নির্ভর করবে।’

এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্বালানি প্রধান জেস রালস্টন বলেন, এই সংকট আবারও দেখাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার খরচ কতটা বেশি। তার মতে, নেট-জিরো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একমাত্র পথ।

ই৩জি থিঙ্কট্যাংকের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বেথ ওয়াকার বলেন, সরকারগুলোর উচিত এই অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর বসিয়ে সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো নয়।

এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সৌদি আরামকো, শেল ও টোটালএনার্জিস। অন্যদিকে এক্সনমোবিল, শেভরন, গাজপ্রম, পেট্রোব্রাস ও এডনক কোনো জবাব দেয়নি।

এই অতিরিক্ত মুনাফা হিসাব করা হয়েছে রিস্টাড এনার্জির ইউকিউব ডাটাবেস ব্যবহার করে, যেখানে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস ক্ষেত্রভিত্তিক তথ্য, বাজার চাহিদা ও সরবরাহের পূর্বাভাস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসে তেলের গড় দাম ১০০ ডলার ধরা হয়েছে এবং যুদ্ধের আগে ৭০ ডলার দামের সঙ্গে তুলনা করে অতিরিক্ত মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে কর, রয়্যালটি, মূলধন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় বিবেচনা করা হয়েছে।

যেসব দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, তারা এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষিত রয়েছে। যুক্তরাজ্যে মার্চ মাসে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে ১ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের গ্যাস আমদানি এড়ানো গেছে। ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বায়ু শক্তি ভোক্তাদের প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করেছে।

ই৩জির জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পাস্তুখোভা বলেন, যতদিন ঘরবাড়ি, পরিবহন ও শিল্প তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন যুক্তরাজ্যসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলো বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিতে থাকবে।

তিনি বলেন, ‘জ্বালানির উৎস দেশীয় হোক বা বিদেশি, ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন জ্বালানি নিরাপত্তার কার্যকর সমাধান নয়।’

যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, এই সংকটে জনগণের পাশে থাকতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা নিজস্ব পরিষ্কার জ্বালানি উৎপাদন বাড়িয়ে বিল কমাতে কাজ করছে এবং মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যায্য ব্যবসা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিয়েছে।


   আরও সংবাদ