ঢাকা, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

প্রাণ ফিরছে ‘জিয়া খালে’

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১২ বার


প্রাণ ফিরছে ‘জিয়া খালে’

যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী-যদুনাথপুরে ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে শুরু হওয়া স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক এ প্রকল্প দীর্ঘদিনের অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও, তা পুনঃখননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এবার খালটি পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিচ্ছেন জিয়াউর রহমানের ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার আগমন ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনকে ঘিরে শার্শাসহ আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের তৎপরতায় চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

 

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর সেচব্যবস্থা জোরদার করে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অংশ ছিল এ উদ্যোগ। সে সময়টায় যশোরের মানুষ এ উদ্যোগকে ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা দিয়েছিল।

 

 

যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শার্শা উপজেলার উলশী গ্রামে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এলাকাটির বেতনা নদী সর্পিলাকার হওয়ায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে প্রবাহিত হতো। এ অবস্থায় উলশী ও যদুনাথপুরের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আড়াআড়ি একটি খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১ কোটি ৪৪ লাখ ঘনফুট মাটি অপসারণ করে মাত্র ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪ মিটার গভীর একটি খাল খনন করা হয়।

এর ফলে নদীপথের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসে। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে খালটির উদ্বোধন করেন। স্থানীয়ভাবে তখন থেকেই এটি ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিত।

খাল খননের গল্প
উলাশী গ্রামের প্রবীণ এক বাসিন্দার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই দিনের দৃশ্য। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে এসে স্থানীয় একটি স্কুল মাঠে অবতরণ করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি হেঁটে সরাসরি খাল খননের স্থানে যান এবং নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটার মাধ্যমে উদ্বোধন করেন কর্মসূচির।

স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মাটি কেটে একটি ঝুড়িতে ভরে উপস্থিত একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাথায় তুলে দেন। রাষ্ট্রপতি নিজেও সেদিন স্থানীয়দের ব্যবহৃত মাথাল পরেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে খাল খননের কাজে অংশ নেন। পুরো এলাকায় তখন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ এসে এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত থেকে শ্রমে অংশ নেন।

প্রবীণরা জানান, সে সময় কোনো পারিশ্রমিক ছিল না। মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে দুপুরে শুধু রুটি ও গুড় খাওয়ার ব্যবস্থা থাকত। খালের পাড়েই অস্থায়ীভাবে রুটি তৈরি করা হতো এবং সেখানেই সবাই খেয়ে আবার কাজে ফিরতেন। রাষ্ট্রপতির প্রতি ভালোবাসা ও আস্থাই মানুষকে এভাবে শ্রম দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর শার্শার কয়েকটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ছিল। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। বর্ষা মৌসুমে পানি আটকে থাকায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং এলাকার মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ত।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যশোর অঞ্চলে সফরে এসে স্থানীয়দের সমস্যার কথা শোনেন। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যদি বিলগুলোর পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি খাল খনন করা যায়, তাহলে বিপুল পরিমাণ জমি চাষযোগ্য হবে এবং কৃষিতে বড় পরিবর্তন আসবে। এরপরই তিনি প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

খাল খনন সম্পন্ন হওয়ার পর পানি নিষ্কাশনের পথ খুলে যায় এবং বিপুল জমিতে চাষাবাদ শুরু হয়। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এতে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং এলাকায় সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তীতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একাধিক পাম্প স্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে আধুনিক কৃষি চর্চা, বিশেষ করে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়, যা খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।

প্রবীণ স্থানীয়দের স্মৃতিতে আজও সেই খাল খনন কর্মসূচি একটি বড় সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে রয়ে গেছে, যা একসময় এলাকার কৃষি ও জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

খাল খনন পরবর্তী কর্মসূচি
উলশী-যদুনাথপুর সংযোগ খালকে কেন্দ্র করে বাস্তবায়ন করা হয় ‘সারথী স্বনির্ভর কর্মসূচি’, যা শুধু একটি সেচ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এলাকার সার্বিক উন্নয়নকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয় সমন্বিত উদ্যোগ। এ কর্মসূচির অধীনে উৎপাদন দ্বিগুণ করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সবার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করাসহ মোট ৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

45

সংগৃহীত ছবি

প্রকল্পের আওতায় সংযোগ খালে ১০ হাজার নাইলোটিকা মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয় এবং খালের দুপাড়ে রোপণ করা হয় ১৫ হাজার খেজুরের চারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ১১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ২০০ জনকে চিকিৎসা প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নারীদের জন্য ১৯টি সমিতি গঠন করা হয়।

সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বসানো হয় ২২টি গভীর নলকূপ ও ৩৩টি পাওয়ার পাম্প। এর ফলে বনমান্দার, সোনামুখী, কাগমারী ও রাজাপুর বিল এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর হয় এবং বিল অঞ্চলের হাজার হাজার একর জমি নতুন করে চাষাবাদের আওতায় আসে।

উলশী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আসাদ মিঞ্জা স্মৃতিচারণ করে বলেন, খাল খননের পর পাঁচটি বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ শুরু হয়। এ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো ইরি (বোরো) ধানের চাষের প্রচলনও তখনই বিস্তার লাভ করে। খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ার ফলে পুরো এলাকা ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।

উলাসী–যদুনাথপুর খাল খনন কর্মসূচির সাফল্যের পর বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে ১৯৭৭ সালে সারা দেশে ব্যাপক খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে এই উদ্যোগটি ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি পায়, যা গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেচ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি করা। তখন বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী ও সমুদ্রে নেমে যেত, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমি পানির তীব্র সংকটে পড়ত। ফলে কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে শুরু হওয়া খাল খনন কর্মসূচি দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া জাগায়। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে গ্রামীণ পানি প্রবাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পায়, বহু অনাবাদি জমি চাষযোগ্য হয়ে ওঠে এবং কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই উদ্যোগকে অনেকেই বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করেন, যা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার নীতিনির্ধারণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

তবে সময়ের পরিক্রমায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই খালটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যায় এবং কার্যকারিতা হারাতে থাকে। বর্তমানে খালটি অনেকাংশে মজে গিয়ে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় দীর্ঘ ৫০ বছর পর সেই ঐতিহ্যবাহী খাল পুনরুদ্ধারে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানান, উলাসী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সার্ভে কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ও নকশা অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে টেন্ডার আহ্বান করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর আগে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী–যদুনাথপুর এলাকায় খাল খননের মাধ্যমে যে উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সেই ধারাবাহিকতাকেই সামনে রেখে এ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করেই বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান, যেখানে গ্রামীণ পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নে খাল পুনঃখননকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

খাল পুনঃখনন ও প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাইদুজ্জামান সাগর বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরে উলশী-যদুনাথপুর খালটি যথাযথ সংস্কার না হওয়ায় আজ এটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এখন সেই খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা এই খালটির পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমরা এ উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই পুনঃখনন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ‘জিয়া খাল’ আবারও তার হারানো প্রবাহ ও প্রাণ ফিরে পাবে। সেচের পানিতে ভরে উঠবে কৃষিজমি, কৃষকের মুখে ফিরবে স্বস্তি, আর শার্শার উলশীতে রচিত হবে উন্নয়ন ও উৎপাদনের নতুন অধ্যায়।


   আরও সংবাদ