স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার
ডালাস স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় আর রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ দেখল বিশ্ব। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, ইনজুরি, বিশ্বরেকর্ড আর শেষ মুহূর্তের গোল উত্তেজনার সব উপাদানে ঠাসা ছিল স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যকার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচটি গোলশূন্য থাকায় যখন অতিরিক্ত সময়ের আবহ তৈরি হচ্ছিল, ঠিক তখনই রদ্রি-মেরিনো জুটির জাদুতে ডেডলক ভাঙল স্পেন। স্টপেজ টাইমের প্রথম মিনিটে মিকেল মেরিনোর দুর্দান্ত গোলে পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
আর এই হারের মাধ্যমে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল পর্তুগাল। সেই সাথে অশ্রুসিক্ত চোখে হয়তো নিজের শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মহাতারকা ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে একটি বিশ্বকাপ শিরোপার চিরন্তন আক্ষেপ বুকে নিয়েই হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চকে বিদায় বলতে হচ্ছে এই পর্তুগীজ যুবরাজকে।
ম্যাচের কিক-অফের পর থেকেই দুই পরাশক্তি আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজায়।
৩ ও ৮ মিনিটে স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল দুটি সুবর্ণ সুযোগ পেলেও পর্তুগিজ কিপার দিয়েগো কস্তার দেয়াল ভাঙতে পারেননি। স্পেনের এই আক্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই পাল্টা আঘাত হানে পর্তুগাল। ম্যাচের ৮ মিনিটেই ব্রুনো ফের্নান্দেসের রক্ষণচেরা থ্রু পাস থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নেওয়া দুর্দান্ত শট কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন স্পেনের উনাই সিমন। ১৬ মিনিটে লামিনে ইয়ামাল ও অ্যালেক্স বায়েনার ব্যাক-টু-ব্যাক আক্রমণ প্রতিহত করে পর্তুগালকে আবারো ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন দিয়েগো কস্তা।
তবে প্রথমার্ধের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে ৪১ মিনিটে। পর্তুগালের নুনো মেন্দেসের বাম পায়ের জোরালো শট স্পেনের পেদ্রো পোরোর মাথায় লেগে জালের দিকে ছুটলে তা অবিশ্বাস্যভাবে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। কপাল জোরে বেঁচে যাওয়া স্পেন ঠিক তার পরের মিনিটেই (৪২ মিনিটে) ফুটবল ইতিহাসের অমর এক রেকর্ডে নিজেদের নাম লেখায়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং চলমান ২০২৬ আসর মিলিয়ে টানা ৫৬১ মিনিট জাল অক্ষত রেখে সুইজারল্যান্ডের ১৬ বছর পুরোনো বিশ্বরেকর্ড (৫৫৯ মিনিট) ভেঙে দেয় ‘লা রোহা’রা।
বিরতির পর ম্যাচের ৫২ মিনিটে ডান পাশ দিয়ে দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ে পর্তুগিজ ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন বার্সেলোনার তরুণ ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামাল, তবে শেষটা ভালো করতে পারেননি তিনি। এর কিছুক্ষণ পরেই পর্তুগাল শিবিরে বড় ধাক্কা আসে। পুরো ম্যাচ জুড়ে ইয়ামালকে দারুণভাবে সামলানো ডিফেন্ডার নুনো মেন্দেস চোট পেয়ে ৫৬ মিনিটে মাঠ ছাড়েন, তার জায়গায় আসেন নেলসন সেমেদো।
ম্যাচের দ্বিতীয় হাইড্রেশন বিরতিতে পর্তুগাল কোচ একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন করে জোয়াও ফেলিক্স ও জোয়াও কানসেলোকে তুলে রাফায়েল লিও ও দিয়োগো দালতকে মাঠে নামান। বিরতির পর বিপজ্জনক জায়গায় সেমেদোর ফাউল থেকে ফ্রি-কিক পায় স্পেন, তবে ইয়ামালের বাঁকানো শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন দিয়েগো কস্তা।
ম্যাচের ৭৫ মিনিটে স্পেন প্রথম পরিবর্তন হিসেবে অ্যালেক্স বায়েনাকে তুলে ফেরান তোরেসকে নামায়। ৭৯ মিনিটে তোরেস ডান প্রান্ত থেকে ডি-বক্সের মাঝে চমৎকার পাস দিলেও তা ট্যাপ-ইন করার মতো কোনো স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড বক্সে উপস্থিত ছিলেন না।
ম্যাচ যখন একদম শেষ প্রান্তে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ঠিক আগমুহূর্তে স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে মাস্টারস্ট্রোক খেলেন। পেদ্রি ও দানি ওলমোকে তুলে তিনি মাঠে নামান ফাবিয়ান রুইজ ও মিকেল মেরিনোকে।
কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিতে এক মিনিটও সময় নেননি মেরিনো। স্টপেজ টাইমের প্রথম মিনিটে (৯০+১ মিনিটে) রদ্রির একটি নিখুঁত, ডিফেন্সচেরা পাস ধরে অসাধারণ এক ফিনিশিংয়ে পর্তুগালের জাল কাঁপান বদলি নামা মিকেল মেরিনো। উল্লাসে ফেটে পড়ে ডালাস স্টেডিয়ামের স্প্যানিশ গ্যালারি।
স্পেনের এই বাঁধভাঙা আনন্দের বিপরীতে অন্য প্রান্তের চিত্রটি ছিল চরম বিষাদের। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় পর্তুগালের বিদায়। আর এই বিদায়ের সাথে অবসান ঘটল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় এক অধ্যায়ের। ৪১ বছর বয়সে এসে নিজের শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি ছোঁয়ার যে অধরা স্বপ্ন বুকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রেখেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, তা ডালাসের মাঠেই থমকে গেল। ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতলেও, একটি বিশ্বকাপ শিরোপার আক্ষেপ নিয়েই হয়তো বিদায় বলতে হবে ফুটবল ইতিহাসের এই মহানায়ককে। শেষ হলো এক মহাকাব্যিক রাজকীয় যাত্রা।