ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিদ্যুৎ-সুপেয় পানির সংকটে লাখো মানুষ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার


 বিদ্যুৎ-সুপেয় পানির সংকটে লাখো মানুষ

চট্টগ্রাম: টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে ভয়াবহ বন্যার শিকার হয়েছে বাঁশখালী। পানিতে ভেঙে পড়েছে মাটির ঘর, ভেসে গেছে মাছের ঘের, তলিয়ে গেছে কৃষিজমি আর ডুবে গেছে রান্নার চুলা।

পাশাপাশি টানা তিন ধরে বিদ্যুৎহীন অনেক এলাকা ডুবে আছে অন্ধকারে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংক।

খাবারের অভাব ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগের মধ্যে দিন কাটছে হাজারো মানুষের। এরই মধ্যে শুক্রবার (১০ জুলাই) পানির তীব্র স্রোতে ভেসে মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর।

 

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভাসহ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বন্যার পানিতে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৫০০ কাঁচামাটির ঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

 

পানির স্রোতে তিন শিশুর মৃত্যু

শুক্রবার (১০ জুলাই) উপজেলার বাহারচড়া ও সরল ইউনিয়নে পৃথক তিনটি ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন, বাহারচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে আশিক (৭), একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মিরাজ (৩) এবং সরল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকার আব্দুল করিমের মেয়ে মোছাম্মৎ তাহিন নূর (১২)।

বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ, থমকে গেছে জনজীবন

বৈলছড়ি এলাকার প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম জেলা শহরের সঙ্গে বাঁশখালীর সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র ভরসা। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও গলা সমান পানি থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ctg4


ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমিতে ব্যাপক ক্ষতি

পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে শত শত মাছের ঘের, পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প ভেসে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে অনেক মৎস খামারি। পাশাপাশি বিস্তীর্ণ শাকসবজির ক্ষেত এবং আমন ধানের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

 আশ্রয়কেন্দ্রেও ঢুকেছে পানি

নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অনেক আশ্রয়কেন্দ্রেও পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা এতটাই বেড়েছে যে ঘরের টিনের চাল পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধার করতে না পেরে অনেক পরিবার খালি হাতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

দুর্গত এলাকার অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ঘরে পানি ঢুকে রান্নার চুলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা এখনো অনেক কম। তারা দ্রুত পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবার দাবি জানিয়েছেন।

চার-পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন পুরো জনপদ

বাঁশখালী পৌরসভাসহ প্রায় পুরো উপজেলাই গত চার থেকে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। উপজেলা সদরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সীমিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া হলেও অধিকাংশ গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছে।

গন্ডামারা, সরল, ছনুয়া, শেখেরখীল, নাপোড়া, চাম্বল, কঠরিয়া, বৈলছড়ি, বাহারছড়া, শীলকূপ, পশ্চিম গুনাগরি, সাধনপুর ও পুকুরিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন।

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে বিদ্যুতের লাইনের ওপর পড়েছে। অনেক খুঁটি ভেঙে গেছে। সাবস্টেশন ও ট্রান্সফরমারে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক দুর্গত পরিবার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছেন না।

বাঁশখালী জোনাল অফিসের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম আতিকুর রহমান বলেন, প্রকৌশলী ও লাইনম্যানরা মাঠে কাজ করছেন। তবে যেসব এলাকায় এখনো কোমর বা বুকসমান পানি রয়েছে, সেখানে নিরাপদ পরিবেশ না পাওয়া পর্যন্ত মেরামত কাজ সম্ভব হচ্ছে না। পানি নেমে গেলে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।

ctg5

উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে

এদিকে উদ্ধার অভিযান অব্যহত রেখেখে ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা।চেচুরিয়া ব্রিজ এলাকা থেকে একটি শিশুসহ ১৩ জনকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া বিকেলে বিকেলে বাহারছড়া ইউনিয়ন এলাকা থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে সংস্থাটি।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আমাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেখানেই খবর পাচ্ছি, সেখানেই আমাদের টিম যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। শুক্রবার বিকেলেও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রাম থেকে বৃদ্ধ, শিশু ও অসহায় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এ পর্যন্ত ৪৭ টন চাল, ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং দেড় হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দুর্গত মানুষের তুলনায় এই সহায়তা এখনো অপ্রতুল।

ctg5

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, সাতটি ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এছাড়া  ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে কাজ করছেন।


   আরও সংবাদ