ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৩০ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
ঢাকা: রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাটারি চার্জের চাহিদাও। নগরীর বিভিন্ন গ্যারেজ, অলিগলি এমনকি ফুটপাতেও গড়ে উঠছে ছোট-বড় চার্জিং পয়েন্ট।
কোথাও বাণিজ্যিক মিটারে বৈধভাবে চলছে এই কার্যক্রম, আবার কোথাও বাণিজ্যিক মিটারের আড়ালে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে হুকিং বা বাইপাস করেও চার্জ দেওয়ার তথ্য মিলেছে।
কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের এই প্রবণতায় একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে বাড়ছে বিদ্যুৎ চুরি, অতিরিক্ত লোড, অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ফলে রাজধানীর অটোরিকশা চার্জিং ব্যবস্থা এখন শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ও জননিরাপত্তার বড় প্রশ্ন।
আধুনিক বিশ্বে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পরিকল্পিত ও বৈধ চার্জিং স্টেশন গড়ে উঠলেও বাংলাদেশে এখনো সেই অবকাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে অটোরিকশার বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ।
বাণিজ্যিক মিটারে খরচ বেশি, তাই আবাসিক সংযোগের দিকে ঝোঁক
রাজধানীর তেজগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী, গোড়ান, বাসাবো, মুগদা, মান্ডা, মেরাদিয়া ও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার থাকলেও সেখানে থাকা সব অটোরিকশা ওই সংযোগেই চার্জ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গ্যারেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেলায় অনেক গ্যারেজে অটোরিকশার সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও রাতে গ্যারেজগুলো রিকশায় পূর্ণ হয়ে যায়। কোথাও আবার ফুটপাতের ওপরই অস্থায়ীভাবে মিটার বসিয়ে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এসব যানবাহন চার্জ দিতে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করার কথা। কিন্তু বাণিজ্যিক মিটারে বিদ্যুতের খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কিছু গ্যারেজ মালিক কম খরচে চার্জ দেওয়ার বিকল্প পথ খুঁজছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ দিতে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। বাণিজ্যিক মিটারে একটি অটোরিকশা চার্জ দিতে খরচ পড়ে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। বিপরীতে আবাসিক মিটারে একই অটোরিকশা চার্জ দিতে খরচ হয় প্রায় ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা।
অর্থাৎ প্রতিটি অটোরিকশার ক্ষেত্রে চার্জিং খরচে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্যই কিছু গ্যারেজ মালিককে বাণিজ্যিক সংযোগের পাশাপাশি আবাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ।
এক গ্যারেজে ৫০ রিকশা, অর্ধেকের চার্জ আবাসিক লাইনে
কথা বলে জানা গেছে, কোনো কোনো গ্যারেজে ৫০টি পর্যন্ত অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়। কিন্তু সবগুলো রিকশা বাণিজ্যিক মিটারের আওতায় চার্জ দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর একটি অংশ বাণিজ্যিক মিটারে এবং বাকি অংশ আশপাশের বাসাবাড়ির আবাসিক মিটার থেকে সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়া হয় বলে কয়েকজন চালক জানিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো গ্যারেজে অভিযান বা পরিদর্শনে গেলে সামনে রাখা হয় বাণিজ্যিক মিটার। এতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, গ্যারেজের সব অটোরিকশাই বৈধ বাণিজ্যিক সংযোগের মাধ্যমে চার্জ হচ্ছে। কিন্তু গ্যারেজের পেছনে কিংবা পাশে থাকা কোনো বাসা থেকে গোপনে বিদ্যুতের লাইন টেনে অন্য অটোরিকশাগুলো চার্জ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্যারেজ মালিকরা সরাসরি এমন তথ্য স্বীকার না করলেও কয়েকজন অটোরিকশাচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
মেরাদিয়ায় চালকের মুখে ‘দুই মিটারের’ গল্প
মেরাদিয়ার হিন্দুপাড়া এলাকার একটি গ্যারেজের এক অটোরিকশাচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে বলেন, তার গ্যারেজে ৪০টির বেশি অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। ওই মিটারের মাধ্যমে দিনে প্রায় ১৫টি রিকশা চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাকি অটোরিকশাগুলোর চার্জিংয়ের জন্য গ্যারেজের পেছনে থাকা মালিকের বাসার বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার করা হয়।
ওই চালকের দাবি, এতে চার্জিংয়ের খরচ অনেক কম পড়ে।
এই বক্তব্য রাজধানীর অটোরিকশা চার্জিং ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে-একটি গ্যারেজে যতগুলো রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, তার সবগুলোর বিদ্যুৎ খরচ কি সত্যিই বাণিজ্যিক মিটারে হিসাব হচ্ছে?
তেজগাঁওয়ের ফুটপাতেও ছিল চার্জিংয়ের ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা’
সরেজমিনে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ট্রাকস্ট্যান্ড ও লাভ রোডের ফুটপাতে অস্থায়ী রিকশার গ্যারেজের অস্তিত্বের তথ্যও পাওয়া যায়।
সেখানকার এক রিকশাচালক আবদুর রহিম বাংলানিউজকে বলেন, আগে এই সড়কে অটোরিকশায় সরাসরি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে লাইন টেনে চার্জ দেওয়া হতো। তবে কয়েকদিন আগে অভিযান চালানোর পর সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, অভিযানের পর ওই অটোরিকশার গ্যারেজগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে থাকা রিকশাগুলোর বেশিরভাগই ব্যাটারিচালিত নয়, পায়ের রিকশা।
অর্থাৎ অভিযান চালালে অবৈধ সংযোগ ও অস্থায়ী চার্জিং পয়েন্ট বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, অন্য এলাকায় একই ধরনের ব্যবস্থা এখনো চলছে কিনা এবং বন্ধ করা পয়েন্টগুলো অন্য কোথাও নতুন করে গড়ে উঠছে কিনা।
তেজগাঁওয়ে ২৫ রিকশা, মাসে বিদ্যুৎ বিল ৯০ হাজার টাকা
তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড রোডের ফুটপাতের তিনটি গ্যারেজের মালিক মো. হেদায়েত উল্লাহ খান (ছদ্মনাম) বাংলানিউজকে জানান, বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৫টি রিকশা চার্জ দেওয়া হয়।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব রিকশার জন্য মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়। চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন গাড়িপ্রতি ৪০০ টাকা জমা নেওয়া হয়। এই জমার মধ্যেই চার্জিংয়ের খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
হেদায়েত উল্লাহ বলেন, একটি ভালো ব্যাটারি একবার চার্জ দিলে প্রায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা চলে। তবে ব্যাটারির ধরন ও গাড়ির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে দিনে একাধিকবার চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এখানেই উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব-একটি গ্যারেজে যত বেশি অটোরিকশা, তত বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে গ্যারেজের মিটারের ক্ষমতা, মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং মিটারে প্রদর্শিত খরচের সঙ্গে বাস্তবে থাকা রিকশার সংখ্যা মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বিদ্যুৎ সংযোগের বৈধতা প্রসঙ্গে হেদায়েত উল্লাহ বলেন, আগে ফুটপাতের পাশে মিটার দেওয়া হতো। পরে বৈধ-অবৈধ অনেক মিটারই কেটে নেওয়া হয়েছে।
তার নিজের মিটার নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে কম্পিউটারে যাচাই করে তাকে জানানো হয়, তার মিটারে কোনো সমস্যা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মিটারে টাকা না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অবৈধভাবে লাইন নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ চাইলে তার গ্যারেজে থাকা রিকশার সংখ্যা এবং মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব যাচাই করে দেখতে পারে।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে হেদায়েত উল্লাহ বলেন, তিনি বাণিজ্যিকভাবে ডেসকো থেকে কার্ড মিটার অনুমোদন করিয়ে বৈধভাবেই চার্জিংয়ের ব্যবসা চালাচ্ছেন।
তার ভাষায়, ‘আমার স্পষ্ট কথা হলো, ১০ টাকা আয় হলে সেটাই ভালো, কিন্তু জালিয়াতি বা চুরি করে ব্যবসা করতে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ, যারা মিটার ছাড়া এভাবে অবৈধ ও বিপজ্জনক উপায়ে অটোরিকশা চার্জ দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
চার্জিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মিটার ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিটার স্থাপনে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা এবং তারসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। মিটার স্থাপনের জন্য বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াতেও সময় লাগে।
মিটার আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে?
অটোরিকশা চার্জিং নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। একটি গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার থাকলেই কি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যে গ্যারেজের সব অটোরিকশা ওই মিটার থেকেই চার্জ হচ্ছে?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তবে কোনো কোনো গ্যারেজে এমন কৌশল নেওয়া হয়, যেখানে বাণিজ্যিক মিটারটি বৈধভাবে রাখা হয়; কিন্তু পাশাপাশি আবাসিক মিটার থেকে গোপনে সংযোগ নেওয়া হয়।
অর্থাৎ বাইরে থেকে বৈধতার একটি চিত্র থাকলেও ভেতরে অন্য সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ থাকে।
আবার কোনো কোনো এলাকায় সরাসরি বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে বাইপাস করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে একদিকে বিদ্যুতের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ডেসকোর দাবি, অবৈধ সংযোগে নজরদারি চলছে
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো)-এর চীফ ইঞ্জিনিয়ার (নেটওয়ার্ক অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার মো. মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘এখন যারা চার্জ দেয়, তাদের অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ নেই। আমাদের বিশেষ টিম সময় সময় নজরদারি করে। এরপরও অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে লাইন কেটে মামলা দেওয়া হয়।’
৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের তথ্য
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি অবৈধ গ্যারেজ গড়ে উঠেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ডিএমপির প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অনুমোদিত ও অননুমোদিত মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। সারাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জানা গেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে দৈনিক মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ বা প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শুধু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পেছনে ব্যবহার হয়। এর একটি বড় অংশ আবাসিক মিটারের অপব্যবহার, কার্ড মিটারে কারচুপি এবং সরাসরি হুকিং বা বাইপাসের মতো অবৈধ উপায়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বৈধ গ্রাহকদের ওপরও বাড়ছে চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে হুকিং এবং বাসাবাড়ির আবাসিক সংযোগ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করলে পুরো বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
অবৈধ সংযোগের কারণে সিস্টেম লস বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈধ গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়।
একটি আবাসিক মিটার দিয়ে নিয়মিত একাধিক অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হলে সেই মিটার যে লোডের জন্য অনুমোদিত, তার তুলনায় বাস্তবে অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। এতে বৈদ্যুতিক তার, সংযোগ ও অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড বা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হাদিউজ্জামান বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের উপযোগিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে চার্জিং প্রক্রিয়াকে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, আবাসিক মিটারে বাণিজ্যিক চার্জিং পুরোপুরি বন্ধ করা, মিটার বাইপাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্ধারিত স্থানে বৈধ ও সুরক্ষিত বাণিজ্যিক ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমেই এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।
একই সঙ্গে গ্যারেজ মালিকদেরও বুঝতে হবে, কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আবাসিক মিটার বা সরাসরি মূল লাইন ব্যবহার করা শুধু আইনভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি করে না; এটি গ্যারেজ, চালক এবং আশপাশের মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
অভিযান চলছে, কিন্তু সমস্যার শেষ কোথায়?
অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ড ও লাভ রোডের ঘটনাও তার একটি উদাহরণ।
কিন্তু অভিযান চালিয়ে একটি জায়গা বন্ধ করার পর যদি অন্য এলাকায় একই ধরনের চার্জিং পয়েন্ট গড়ে ওঠে, তাহলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। এ কারণে শুধু অভিযান নয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য পরিকল্পিত ও বৈধ চার্জিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোন ধরনের মিটারে কতসংখ্যক অটোরিকশা চার্জ দেওয়া যাবে, কী পরিমাণ লোড অনুমোদিত হবে এবং চার্জিং স্টেশন কোথায় স্থাপন করা যাবে-এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন বলেও মত তাদের।
সমাধান কি বৈধ চার্জিং স্টেশন?
গ্যারেজ মালিক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোরিকশার সংখ্যা যেহেতু দিন দিন বাড়ছে, তাই শুধু অবৈধ চার্জিং বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন বৈধ বিকল্প ব্যবস্থা।
গ্যারেজ মালিকদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বাণিজ্যিক মিটার, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অনুমোদিত চার্জিং সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে বিদ্যুৎ চুরি কমবে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব পাবে।
রাজধানীর সড়কজুড়ে ছুটে চলা লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাই শুধু যানবাহন ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, রাজস্ব, নিরাপত্তা ও জনজীবনের প্রশ্ন।
অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বন্ধের পাশাপাশি বৈধ চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা, মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আবাসিক সংযোগের অপব্যবহার বন্ধ করা-এই তিনটি বিষয়েই এখন কার্যকর নজরদারি জরুরি।
তা না হলে বাণিজ্যিক মিটারের আড়ালে আবাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা যেমন বিদ্যুৎ খাতকে রাজস্ববঞ্চিত করবে, তেমনি অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ যেকোনো সময় ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।