ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৫:৫৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৫ বার
বাংলাদেশের সর্বশেষ সংসদীয় আসন ৩০০ নম্বর—পার্বত্য জেলা বান্দরবান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জেলায় বসবাস করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালিসহ মোট ১২টি সম্প্রদায়। তবে পাহাড়ঘেরা এই জনপদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এখনো অনেকের জন্য কঠিন বাস্তবতা।
সাতটি উপজেলা, দুইটি পৌরসভা ও ৩৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বান্দরবান জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪৪২ জন।
এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬৭ জন।
এই আসনের মোট ১৮৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৫৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত দুর্গম এলাকার ১১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠাতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে ভোটারদের পাড়ি দিতে হয় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ।
রুমা উপজেলার কাপ্রু পাড়ার বাসিন্দা সংচাং ম্রো বলেন, আমাদের ভোটকেন্দ্র পালংমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে পৌঁছাতে হেঁটে যেতে হয় প্রায় ২০ কিলোমিটার। আবার গাড়িতে জেলা শহর হয়ে গেলে পথটা হয় প্রায় ৯০ কিলোমিটার।
বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের দোলাপাড়া, তাংখুংপাড়া ও মংহ্লাপাড়ার ভোটারদের অবস্থাও একই রকম।
মংহ্লাপাড়ার বাসিন্দা লিংপাত ম্রো জানান, ভোট দিতে আমাদের অন্তত ৮ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়।
জেলার অন্তত তিনটি উপজেলার দুর্গম এলাকার ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিছুদূর সড়কপথ থাকলেও ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। ফলে এসব এলাকার ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সম্প্রতি নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়েছে।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ১১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হেলিকপ্টারে পাঠানো হয়। এসব কেন্দ্রকে ‘হেলিস্টি’ কেন্দ্র বলা হয়। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের কারণে আগের তুলনায় হেলিস্টি কেন্দ্রের সংখ্যা কমেছে। একসময় এ সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ১৮টি।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৮৬টি। এর মধ্যে ৩৮টি অতিদুর্গম কেন্দ্র, যেখানে মুঠোফোন নেটওয়ার্ক নেই। অধিকাংশ কেন্দ্রে সড়ক যোগাযোগ নেই, কোথাও সীমিত আকারে রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের পায়ে হেঁটে আসতে হয়।
এ ছাড়া প্রায় ৩০টি ভোটকেন্দ্রে কিছুদূর পায়ে হেঁটে এবং পরে সড়কপথে যাতায়াত করা সম্ভব হলেও ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোটারদের পুরো পথটাই হেঁটে যেতে হয়। আসনের অন্তত ৫০টি ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও নেই।
বান্দরবান জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল আলম জানান, দুর্গম ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায়। থানচি উপজেলা সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে জেলার সবচেয়ে দূরের ভোটকেন্দ্র বড় মদক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
জেলা পরিষদের সদস্য রাংলাই ম্রো বলেন, রেমাক্রী ইউনিয়নের বড় মদক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন পানঝিরি, লৈইক্রী ও আন্ধারমানিক এলাকার বাসিন্দারা ভোট দিতে আসেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আসতে জনপ্রতি এক হাজার টাকা লাগে। এক রাত থাকা-খাওয়ার খরচসহ প্রায় দুই হাজার টাকা ব্যয় হয়। তিন্দু ইউনিয়নের কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ১০টি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্গম কেন্দ্রে ভোটার আনা, আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন কেন্দ্রে দ্রুত ফলাফল পৌঁছানো।
জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি বলেন, দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের যাতায়াত সমস্যার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে। এত অল্প সময়ে পূর্ণাঙ্গ যাতায়াত ব্যবস্থা করা কঠিন হলেও এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় সীমিত পরিসরে যানবাহন চালু রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।