ঢাকা, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২ মার্চ, ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার


ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম ধাপেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই প্রথম ইসলামি প্রজাতন্ত্র এত বড় সংকটে পড়েছে।

ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযান ছিল ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি চূড়ান্ত আঘাত, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশটির কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেওয়া।

শনিবার রাতের মধ্যেই খামেনির মৃত্যুর খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা কয়েক দিন আগেও অনেকের কাছে অকল্পনীয় ছিল।

বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের বড় শহরগুলোর কিছু এলাকায় মানুষ আনন্দ উদযাপন করছে।

বিদেশে বসবাসরত বহু ইরানিও একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। অনেকের কাছে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ছিল এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা, যা বহু বছরের নাগরিক আন্দোলনও অর্জন করতে পারেনি।

 

হামলার পর দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন এই সুযোগে ‘নিজেদের সরকার নিজেদের হাতে নেয়’। একই সুরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব এবং তা কাম্য।

 

যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। সামরিক দিক থেকে এটি সুসমন্বিত এবং মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে বলে মনে হলেও, ইরানের সাধারণ জনগণের প্রতি রাজনৈতিক আহ্বান কতটা প্রভাব ফেলবে তা অনিশ্চিত।

রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এরপর দ্রুত তিন সদস্যের একটি অস্থায়ী পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যারা নির্বাহী ক্ষমতা সামলাবে।

 

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই ধর্মীয় নেতাদের মেয়াদ আট বছর।

তবে এখানে একটি বড় শর্ত রয়েছে। অ্যাসেম্বলিতে প্রার্থী হতে হলে সবার আগে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’-এর অনুমোদন পেতে হয়। এই ১২ সদস্যের কাউন্সিল আবার শাসন কাঠামোর সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, ছয়জনকে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেন, আর বাকি ছয়জনকে বিচার বিভাগ মনোনীত করে এবং সংসদ অনুমোদন দেয়।

বিচার বিভাগের প্রধানও সর্বোচ্চ নেতার নিয়োগপ্রাপ্ত।

 

অর্থাৎ, যেই প্রতিষ্ঠান তার উত্তরসূরি বেছে নেবে, সেটির ওপরও খামেনির দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। তাই শাসকগোষ্ঠী দ্রুত স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সংবিধানের নিয়ম মেনে অস্থায়ী শাসনব্যবস্থা চালু করে তারা বোঝাতে চায়, শীর্ষ নেতার মৃত্যু হলেও পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি।

এখন সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানে সাধারণত সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম আগে থেকে প্রকাশ করা হয় না; পুরো প্রক্রিয়া হয় বন্ধ দরজার আড়ালে।

অ্যাসেম্বলির ভেতরে একটি ছোট কমিটি রয়েছে, যারা সম্ভাব্য নাম যাচাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করতে পারে। সভাগুলো গোপনে হয় এবং ভোটের ফল প্রকাশ করা হয় না। ফলে বাইরের পর্যবেক্ষণের সুযোগ কম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খামেনির বড় ছেলে মোজতাবার নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে শোনা গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

১৯৮৯ সালের জুনে খামেনি নিজেই যখন সর্বোচ্চ নেতা হন, তখন তাকেও সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ধরা হয়নি। তাই ফলাফল অনুমানের বাইরে চলে যেতে পারে। নির্বাচন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষও হতে পারে, কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

তবে সামরিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রাথমিক হামলায় কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বেঁচে থাকা কর্মকর্তারাও এখনো হামলার ঝুঁকিতে আছেন।

কমান্ড সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত, নেতৃত্ব ছিন্নভিন্ন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া সংকটময় অবস্থায়—অস্থিরতা স্পষ্ট। তবুও ইরান পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। প্রথম দুই দিনের মধ্যেই ইরান বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

প্রথমবারের মতো দুবাইয়ের বেসামরিক স্থাপনা এবং কুয়েতের একটি বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যা সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার অনেক বাড়িয়ে দেয়। এতে বোঝা যায়, নেতৃত্বে বড় ক্ষতি হলেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো আছে এবং তারা তা ব্যবহার করতে প্রস্তুত।

এখন আশঙ্কা বাড়ছে, এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ইরানের নেতৃত্বের দৃষ্টিতে, যদি সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধে যোগ দেয়, তাহলে তেহরান যুদ্ধবিরতির জন্য কিছু কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারে অথবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শর্তে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এড়াতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ এবং নতুন করে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ার দিকেও যেতে পারে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো অংশ যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে বা আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে মাঠের বাস্তবতা পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে পারে।

সামনের কয়েক দিনেই বোঝা যাবে, দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতাকে হারানোর পরও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কাঠামো একত্রে থাকতে পারে কি না। এই মুহূর্তে সব সম্ভাবনাই খোলা।

হামলার আগে যে অবস্থানে ছিল, এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র তার চেয়ে দুর্বল—কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই, গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডাররা নেই আর অব্যাহত সামরিক চাপ রয়েছে।

তবুও তাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সশস্ত্র বাহিনী এবং পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা আছে, যা সহজে শাসন পরিবর্তনের পথকে জটিল করে তোলে।

খামেনির মৃত্যু ইরানকে অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত এক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। এরপর কী হবে তা নির্ভর করবে তেহরান অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে কি না, নতুন করে বিক্ষোভ গতি পায় কি না এবং এই লড়াই কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তার ওপর।

আগামী কয়েক দিনেই চিত্রটি পরিষ্কার হতে পারে, যখন সব পক্ষই নিজেদের সামরিক সীমা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা পরীক্ষা করবে।

বিবিসি নিউজ পার্সিয়ানের আমির আজমীর প্রতিবেদনের অনুবাদ


   আরও সংবাদ