ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ মার্চ, ২০২৬ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬ বার
২০১১ সালের আগস্ট মাস। লিবিয়া তখন আরব বসন্তের হাওয়ায় থরথর করে কাঁপছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক জোট ন্যাটো সরকারবিরোধীদের পক্ষে বিমান হামলা চালায় লিবিয়ায়। এ সুযোগে রাজধানী ত্রিপোলিতে প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার হোসাইন গাদ্দাফির কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়েন বিদ্রোহী সেনারা।
শেষমেশ বিদ্রোহীদের প্রহারে নিহত হন গাদ্দাফি। ইতি ঘটে ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের স্বৈরশাসনের। সে সময় লিবিয়ার জনগণের গণতন্ত্রের বাসনা চরিতার্থ করার গুরুভার কাঁধে তুলে নিয়েছিল পশ্চিমারা। ন্যাটোর হামলা গাদ্দাফিবিরোধী লড়াইয়ের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফসল ঘরে তোলে গাদ্দাফিবিরোধী পক্ষ।
পশ্চিমা পাণ্ডবরা লিবিয়ায় গণতন্ত্র রপ্তানির যে বাগাড়ম্বর দেখিয়েছিল, তার কি হাল এখন? যারপরনাই ভগ্নস্তূপ। আজ অবধি ঐক্য সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ভূখণ্ডটি এখন নিরাপত্তাহীনতা, বিশৃঙ্খলা ও আন্তঃগোত্র বিবাদের সমার্থক।
গাদ্দাফির মৃত্যু স্মরণ করার উপলক্ষ সামনে এল আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শিয়া ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। অবিসংবাদিতভাবে এ শতকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা এটি। গাদ্দাফির মৃত্যু যেমন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রভাবশালী এক উপাদান, সমান সত্য আলী খামেনির ক্ষেত্রেও। গাদ্দাফি থেকে আলী খামেনির মৃত্যু—দুটি ক্ষেত্রেই পশ্চিমাদের বড় বিজ্ঞাপন ছিল ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকার’। বলা হচ্ছে, খামেনিকে হত্যা এবং ইরানকে শায়েস্তা করার হামলাকে যৌক্তিক করে দেখাতে ইরানের রক্ষণশীল ব্যবস্থার বিপরীতে গণ-অভিপ্রায়ের বন্দ্যোবস্তের কথা বলছে ওয়াশিংটন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগীরা পৃথিবীর যেখানেই গণতন্ত্রের দাওয়াই নিয়ে গেছেন সেখানে উলটো নরকের দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র রপ্তানির কথা তুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন। কানে ভেসে আসে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কান্না। স্মৃতিতে আসে লাতিন আমেরিকায় গোয়েন্দা অভিযানে সরকার উৎখাতের ঘটনাগুলো। কোথায় পশ্চিমাদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাওয়াই কোমল স্পর্শের আঁচর কেটেছে? কোথাও না। লিবিয়ার পর ইরানেও সেই ধারাই দেখা যাবে। কারণটা খুব পরিষ্কার, পশ্চিমাদের বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিজ্ঞাপন আসলে ফাঁপা। ভিনদেশি শাসকদের সঙ্গে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না মিললেই তারা গণতন্ত্রের এ শিখণ্ডি খাড়া করে। এক্ষেত্রেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচির লাগাম টানতে না পেরে রণভেরি বাজালেন ট্রাম্প।
…..
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নতুন খেলুড়ে হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যে আগুন জ্বালালেন, সেটি সহসাই থামবে না। যদি ট্রাম্প ট্রিগার থেকে আঙুল না তোলেন, তাহলে ওয়াশিংটনের সামনে দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে, তেলআবিবেরও তাই। যুদ্ধ অর্থনীতির ষোলআনা কসুর তুললে তার প্রতিক্রিয়াটাও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ভিয়েতনামে সায়গন বিমানবন্দর থেকে মার্কিনী সেনাদের পাত্তারি গুটিয়ে পালানোটা পুরনো হলেও আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর থেকে পড়িমরি করে প্রস্থানের স্মৃতি একেবারেই নতুন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন অবধি ইরানের সঙ্গে পূর্ণ যুদ্ধাবস্থায় যায়নি। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের খেলা চলছে আকাশপথে। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে স্থল অভিযানের মতো সিদ্ধান্ত নেন; হয়তো অনাগত ভবিষ্যতে দেখা যাবে, তেহরান থেকে মার্কিন সেনারা ওয়াশিংটনের বিমান ধরছেন বাক্সপেটরা নিয়ে। অবধারিতভাবে পেছনে ফেলে যাবে অগণিত মৃত্যু। ইসরায়েলের জন্য রেখে যাবে আরও যন্ত্রণাকাতর ও উৎকণ্ঠাপূর্ণ দৈনন্দিন জীবন। পাহাড়-পর্বতপূর্ণ ভূপ্রকৃতি, ঝাঞ্জা-বিক্ষুব্ধ মরুপরিবেশ, বিরাট ভূখণ্ড আর স্বাতন্ত্র্যবোধে সমুজ্জল প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী পার্সিয়ান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য প্রতিরোধ ওয়াশিংটন-তেলআবিবের জন্য কবর খুড়ে রেখেছে, নিঃসন্দেহে। শুধু কি তাই, দিনের পর দিন হুরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে যে লম্ফঝম্প শুরু হবে, তা সামাল দিতে গিয়ে মার্কিন অর্থনীতি তো বটেই, গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিই খাবি খাবে। বিশ্ববাণিজ্যে এ যুদ্ধজনিত অভিঘাত সহজে মোকাবিলা করা যাবে না। বিশেষত যুদ্ধ চলতে থাকলে আরব উপদ্বীপ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রতি যে সহানুভূতির জোয়ার তৈরি হবে, তা মার্কিন শাসক এবং সুন্নি মতাবলম্বী রাজতন্ত্রগুলোর জন্য চূড়ান্ত অস্বস্তি ও সংকট তৈরি করবে। ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের আকুতি। সৌদি আরব, বাহরাইন, জর্ডান, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষমতাসীন রাজতন্ত্রগুলো মার্কিন শাসকদের তাবেদার হিসেবে আরও বেশি মাত্রায় সাব্যস্ত হবে। দেশগুলোতে একমুখী সুন্নি মতাদর্শিক আবেগের জায়গায় মুসলিম ভ্রাতৃত্ববাদী মনোভাব অথবা আরব জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ প্রবল হবে। ফলে ইরানে গণতন্ত্রের নাম করে মার্কিন আগ্রাসনকে ওইসব দেশের তরুণরাও নিজ নিজ দেশে একইভাবে পাঠ করতে চাইবে। গণতন্ত্র-বিক্রেতা মার্কিনীদেরও সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, কেন সৌদি আরবে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা তৈরিতে ওয়াশিংটনের আকুতি নেই। পাশাপাশি মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর সামনে আরও মূর্ত হবে, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ওয়াশিংটনের মধুমাখা সম্পর্কের গোলকধাঁধাটা কোথায়। অবশ্যম্ভাবীভাবে, এ অঞ্চলের তরুণদের সামনে দুটি পক্ষ; যার একটি ফিলিস্তিনের লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি আর ভূমি দখলের ক্রীড়নক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ, আরেকটি মজলুম জনগোষ্ঠীর। বলাবাহুল্য ইরানকে সেই নিপীড়িত মজলুমের অংশীদার ভাবতে শেখা তরুণদের হাতে বাদশাহি ক্ষমতার তখত চূর্ণবিচূর্ণ হতে পারে। সুতরাং ইরানে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের অঙ্ক ধাঁধার মতো জটিল।
.....
ইরানে রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশটির অভ্যন্তরে জনরোষের খবর মিথ্যে নয়, বরং নিয়মিতই এর বহি:প্রকাশ দেখা যায়। জনপ্রতিনিত্বের নাম করে ইসলামি বিপ্লবের পরে সেখানে ‘পলিটিক্যাল ট্রাইবালিজম (রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্র)’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে, আলী খামেনিই সকল ক্ষমতার উদগাতা। মতপ্রকাশ, অবাধ চলাফেরা, নারী অধিকারসহ সামগ্রিক বিচারে ইরানি থিওক্রেসির (ধর্মীয় শাসনতন্ত্র) কুশীলবরা অব্যাহতভাবে অমার্জনীয় অপরাধ করছেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গায় নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে নিজেদের বিপদ বাড়িয়েছেন। ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের শক্তিমত্তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি তৈরি করেছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। মতাদর্শিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে হাজির হওয়া সংকটগুলো জনগণের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছিল। অভ্যন্তরীণ মুদ্রার কল্পনাতীত অবমূল্যায়ন এবং নিত্যদিনের সংকটকে উপেক্ষা করে বিপ্লবের ধ্বজাধারীরা নিজেদের মতাদর্শিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। জনগণের উপর ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন কোনো রাখঢাক ছাড়াই। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অধিকার কি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে? এ নিয়ে মাথাঘামানো পরিষ্কারভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের অনধিকারচর্চা। এ অনধিকার হস্তক্ষেপের নেপথ্যে ওয়াশিংটনের পরাশক্তিসুলভ মনোভাব। ইতিহাসে বারংবার তারা স্বীয় স্বার্থে অপরাপর দেশের সার্বভৌম ক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ইরানে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন যদি উপলব্ধ লয়, তবে তা প্রতিপালনের কারিগর হতে পারে ইরানি জনতা। ইরানের জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের কাছে ইরানি শাসকদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের অবলুপ্তি ঘটবেই, কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দলদাস শাসকদের বসিয়ে ইরানি সম্পদ লুণ্ঠনের নীলনকশা প্রতিহত করার পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা হটিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা কায়েম করবে ইরানিরা। এবং সেটাই ঘটবে। মার্কিন আগ্রাসনকে বিনাপ্রশ্নে বিরোধিতা করতে হবে, সেইসঙ্গে ইরানের জনগণের প্রতিরোধ-সংগ্রামকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।
.....
লেখাটি শেষ করব লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ এ. জেরজেসের একটি বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, গণতন্ত্রের ব্যর্থতা ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমালোচনা করে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয় তার বই ‘দ্য গ্রেট বিট্রেয়াল: দ্য স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য মিডল ইস্ট (The Great Betrayal: The Struggle for Freedom and Democracy in the Middle East)’। এতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের শাসনব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমাদের কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রহীনতার নেপথ্যে কোনো সাংস্কৃতিক অযোগ্যতার কারণ নেই। বরঞ্চ ধারাবাহিক দমননীতি, যুদ্ধ এবং বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভিনবত্বে আটকে রেখেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থার আজকের পরিণতির দিকে তাকালে কি এ. জেরজেসের কথাকে অস্বীকার করা যাবে? মোটেও না। ইরানে রেজা শাহ পাহলোভির রাজতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানি তেলসম্পদ লুণ্ঠনের কারবার করেছিল যুক্তরাষ্ট্রই। সেসময় জনগণ ক্ষোভের বারুদে ফুটছিল। সেই বারুদফোটা আগুনের তপ্তপ্রহরে আবির্ভূত হয়েছে ১৯৭৯ সালের শিয়া ইসলামি বিপ্লব। শুধু ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্র গত শতকের মাঝ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বসভ্যতার যত জায়গায় যত ক্ষতিসাধন আর বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তাকে মূল্যায়নের বাটখারা পাওয়াই মুশকিল হবে। মধ্যরাচ্যের বাকি দেশগুলোর গণতন্ত্রহীনতার সংকটেও দায় যুক্তরাষ্ট্রের। দেশে দেশে স্বৈরাচারী শাসকদের অভয় দিয়ে তাদের মাটিতেই সামরিক ঘাটি তৈরি করার কৌশলগত অবস্থানে গণতন্ত্রও নেই, মানবাধিকারও নেই।

মুজাহিদ অনীক: অনুবাদক ও লেখক