ঢাকা, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

জ্বালানি সংকটে আড়াল হচ্ছে সার সংকট

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৭ বার


জ্বালানি সংকটে আড়াল হচ্ছে সার সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে জ্বালানি সংকট। তবে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খাত কৃষিতে সার সংকটের ইস্যুটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সার আমদানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তার ওপর কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে এবারের আমদানি প্রক্রিয়া। আর বাজেট নিয়েও আমদানিকারকদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।

 

তবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ কারখানাগুলো যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সার সরবরাহ করতে পারে, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।

বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, সরকার যেসব কোম্পানির কাছ থেকে ইউরিয়া ও অন্যান্য সার আমদানি করত, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা বন্ধ রয়েছে।

যদিও এরই মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে ২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে সরকারের তহবিল স্বল্পতার কারণে সময়মতো সার আমদানি সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমদানিকারকরা।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত এক মাস ধরে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাই জ্বালানি সংকটের যে বিষয়টি সামনে আনছেন, তা হলো পেট্রল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষের তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটে দেশের অভ্যন্তরীণ এই চিত্র হয়তো মুদ্রার এক পিঠ। কিন্তু অন্য প্রান্তে অপেক্ষা করছে আরও বড় শঙ্কা ও সংকট—কৃষিখাত। সময়মতো সার ও ডিজেল সরবরাহ করা না গেলে মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হবে সাধারণ জনগণ, এমন অভিমত তাদের।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলোর মধ্যে গড়ে মাত্র একটি চালু থাকে। এরই মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কোম্পানি চালু করে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুতরাং দেশের মোট চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকট আরও ঘনীভূত কিংবা দীর্ঘায়িত হলে সার আমদানি কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে, তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) এক কর্মকর্তা জানান, ওমান, ইন্ডিয়া ও কাতার এনার্জিসহ বেশ কিছু কোম্পানির কাছ থেকে সরকার সার আমদানি করত। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তা এখন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি মাসের ৯ ও ১৬ তারিখ দুটি দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। প্রতিটি দরপত্রে ২৫ হাজার টন করে ৪টি ইউনিটে ১ লাখ টন, অর্থাৎ দুটি দরপত্রে মোট ২ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আবার দেশে সেচের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। দেশে লক্ষাধিক গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং পাম্প ডিজেলচালিত। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি সংকটে অনেক কৃষক পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না, ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বোরো ধানের সেচ। এর ফলে সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ছে উৎপাদন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকলে তাদের ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে খরচ আরও বাড়ছে। বাজারে অনেক জায়গায় সরকারি দামের চেয়েও বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। এর ফলে একদিকে কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে সবার চোখ কেবল পেট্রল পাম্পের লাইনের দিকে, কিন্তু কৃষক পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে কি না, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে সার সংকট প্রকট হতে পারে কি না; সেই উদ্বেগ সরকারি-বেসরকারি কোনো মহলেই খুব একটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সারের ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই আমদানিনির্ভর। আমাদের ইউরিয়ার চাহিদা বেশি, কিন্তু মাত্র একটি ইউরিয়া সার কারখানা চালু আছে, বাকিগুলো বন্ধ।

তিনি আরও বলেন, সার ও সেচ সংকটের কারণে উৎপাদন কমবে, খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সে ক্ষেত্রে শুধু নিম্নআয়ের মানুষই নয়, বরং সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়মতো সার সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। ইন্ডিগো গ্লোবাল নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী আমদানিকারক আবতাহি ইসলাম শুভ বলেন, সাধারণত মৌসুম শুরুর ৩ থেকে ৪ মাস আগে সার আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। যখন আমরা চূড়ান্তভাবে পণ্য আনার উদ্যোগ নেব, তখন সরকার সময়মতো এলসির পেমেন্ট করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ এরই মধ্যে বাজেট স্বল্পতার কথাও শোনা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আমদানিকারক বলেন, দেশের ভেতরে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য আনতে হলে ৩০ টাকা দিলেই হয়। কিন্তু উন্নত দেশে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সার আমদানির ক্ষেত্রে, সেখানে ব্যাংকে গ্যারান্টি হিসেবে জমা দিতে হয় ১০০ থেকে ১১০ শতাংশ। ২ লাখ ডলারের পণ্য আনতে হলে দুবাইয়ের কোনো ব্যাংকে জমা রাখতে হবে ২ লাখ ডলার বা তারও বেশি। এরপর সরকারের কাছ থেকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) পাওয়ার পর কোটেড ভ্যালুর ৫ শতাংশ পিজি (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) সরকারি কোষাগারে জমা রাখতে হয়। এতসব প্রক্রিয়ার পরও যদি এলসি জটিলতা থাকে, তবে সময়মতো পণ্য কৃষকের হাতে পৌঁছানো সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। তার ওপর রয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পণ্যের সংকট, জাহাজের সংকট এবং বাড়তি জাহাজ ভাড়া।

এ প্রসঙ্গে বিসিআইসির পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, বৈশ্বিক সংকটে আমদানি কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তবে সার্বিক বিবেচনায় তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারি কারখানাগুলো লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারলে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে না।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে ইউরিয়া উৎপাদন করি। সরকারকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি সারের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে হয়, তবে বিদ্যুৎ খাতে কিছুটা ছাড় দিতে হবে, কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও গ্যাসনির্ভর। সুতরাং শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন নির্বিঘ্ন রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারকে কৌশলী হতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন বহুজাতিক কোম্পানির এই কর্মকর্তা।


   আরও সংবাদ