স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে, ২০২৬ ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৭ বার
২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতারে যখন লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঠেছিল, তখন ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে ভারতের বেঙ্গালুরু কিংবা কলকাতার রাস্তায় ফুটবলপ্রেমীদের উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু চার বছর পর, উত্তর আমেরিকায় যখন মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ আসর বসার অপেক্ষায়, তখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতের কোটি কোটি ফুটবলভক্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
মেক্সিকোতে টুর্নামেন্ট শুরুর আর মাত্র ২৩ দিন বাকি থাকলেও, ভারতে এই মেগা ইভেন্টের সম্প্রচারস্বত্ব কেনার কোনো ক্রেতাই খুঁজে পাচ্ছে না ফিফা।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, কাতার বিশ্বকাপে ভারতের দর্শক উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রায় ৭ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে খেলা উপভোগ করেছিলেন এবং টেলিভিশন দর্শকসংখ্যার দিক থেকে জার্মানি, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের মতো ফুটবল পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ছিল ভারত। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জিওসিনেমায় শুধু ফাইনাল ম্যাচটিই রেকর্ড ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ একসঙ্গে দেখেছিলেন।
২০২২ সালে জিও এই স্বত্ব কিনেছিল ৬০ মিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২৬ পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ নারী বিশ্বকাপের জন্য ফিফা এবার প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্য নির্ধারণ করলেও এখন দাম কমিয়েও কোনো ভারতীয় ক্রেতা পাচ্ছে না তারা।
ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো ম্যাচের সময়সূচি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে ভারতের সময়ের ব্যবধান ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। ফলে অধিকাংশ ম্যাচই ভারতীয় দর্শকদের জন্য মধ্যরাতে বা ভোররাতে অনুষ্ঠিত হবে। মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১৪টি ম্যাচ ভারতের সময় অনুযায়ী মাঝরাতের আগে শুরু হবে। এমনকি নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনাল ম্যাচটি ভারতে দেখা যাবে ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টায়। যেখানে কাতার বিশ্বকাপের ৮২.৫ শতাংশ ম্যাচ মাঝরাতের আগে হয়েছিল, সেখানে এবার টাইমিংটাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইিলারা ক্যাপিটাল’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট করণ তৌরানি জানান, ভারতে এখন টেলিভিশন মিডিয়া কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোই বড় স্পোর্টস ইভেন্ট থেকে বেশি আয় করছে। তৌরানি আরও ব্যাখ্যা করেন, ভারতের ক্রীড়া অর্থনীতি মূলত ক্রিকেটনির্ভর। আইপিএল দেখা দর্শকের একটি ছোট অংশ ফুটবল বিশ্বকাপ দেখে, আর মাঝরাতের পর সেই সংখ্যা আরও সংকুচিত হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, ভারত সরকারের ফ্যান্টাসি বেটিং অ্যাপের ওপর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা ক্রীড়া বিনোদন শিল্পের বড় বাজেটে প্রভাব ফেলেছে।
তাছাড়া, এবারের বিশ্বকাপটি শুরু হচ্ছে আইপিএল ২০২৬-এর ফাইনালের ঠিক ১০ দিন পর, যার কারণে মূল বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের বার্ষিক বাজেটের বড় অংশ ইতিমধ্যেই ক্রিকেটে খরচ করে ফেলেছে। ভারতে ফুটবলের বাজার যে কিছুটা নিম্নমুখী, তা প্রিমিয়ার লিগ এবং লা লিগার সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য কমে যাওয়া দেখলেই বোঝা যায়।
ভারতে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের এই অচলাবস্থা কাটাতে এক ফুটবলপ্রেমী আইনজীবী দিল্লির হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি পিটিশন দায়ের করেছেন। তার দাবি, বিশ্বকাপ দেখতে না পাওয়া সংবিধান প্রদত্ত তথ্য পাওয়ার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। আদালত ইতিমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ভারতের সরকারি টেলিভিশন ‘দূরদর্শন’-এর কাছে এই বিষয়ে জবাব চেয়েছে।
গত সপ্তাহে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ফিফার সঙ্গে শেষ মুহূর্তে চুক্তি করলেও, ভারতের ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। যদি কোনো বেসরকারি চ্যানেল স্বত্ব না কেনে, তবে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সরকারি চ্যানেল দূরদর্শনের ওপরই ভরসা করতে হবে দর্শকদের। আর শেষ পর্যন্ত যদি কোনো সমাধান না আসে, তবে ভক্তদের অনেকেই পাইরেটেড বা অবৈধ স্ট্রিম লিঙ্কের মাধ্যমে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। তবে এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বকাপ উন্মাদনাকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র- আল জাজিরা