ঢাকা, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

১২ বছর জেল খেটে স্বামী হত্যার দায় থেকে মুক্ত হলেন শিউলি

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১ জুন, ২০২৬ ২১:৩৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৯ বার


১২ বছর জেল খেটে স্বামী হত্যার দায় থেকে মুক্ত হলেন শিউলি

 

প্রথমে গলা কেটে; এরপর পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে স্বামীকে হত্যার অভিযোগ ছিল ঢাকার পল্লবীর ভাড়াটিয়া সালেহা খাতুন শিউলির। আদালতে উপস্থাপিত হয় তার ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও’।

 

বিচার শেষে বিচারিক আদালত ফাঁসির আদেশ দেন। শুরু হয় শিউলির কনডেম সেলের জীবন।

 

কিন্তু আপিলে পাল্টে গেল সব।

আইনজীবীর ক্ষুরধার যুক্তিতে উঠে আসে মামলার তদন্তের দুর্বলতা।

 

 

সেই দুর্বলতা আমলে নিয়ে শিউলিকে খালাস দেন উচ্চ আদালত।

হাইকোর্ট বিভাগ বলেন, কেবল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়; এর সমর্থনে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে হয়।

 

 

কিন্তু এ মামলায় তদন্তে গুরুতর ঘাটতি ছিল। 

আদালতের মতে, ভিকটিমকে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানোর দাবি যাচাইয়ে ভিসেরা পরীক্ষা করা হয়নি, জব্দ করা এনার্জি ড্রিংকের বোতল পরীক্ষাও করা হয়নি। এছাড়া রক্তমাখা তোষক ও ছুরির ফরেনসিক পরীক্ষার অভাব, সাক্ষ্য-প্রমাণে অসঙ্গতি এবং স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি এ রায় দেন বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সম্প্রতি এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।

 

আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন ও এইচ এম সানজীদ সিদ্দিকী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তৎকালীন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম আশরাফুল হক, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফাতেমা রশীদ ও মো. আকবার হোসেন।

 

১৪ বছর আগে ২০১২ সালের অক্টোবরে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার সারসংক্ষেপ থেকে জানা যায়, দণ্ডিত শিউলি এবং নিহত ব্যক্তি স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করেছিলেন। তারা পল্লবীতে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার মহসিনের বয়স অনুমান ৪৭ বছর। একটি বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য ছিলেন তিনি। ২০১২ সালের ২৭ অক্টোবর নিহতের বড় ভাই পল্লবী থানায় এজাহার দায়ের করেন। 

 

এজাহারে বলা হয়, ২৬ অক্টোবর তাদের বাসায় দণ্ডিত শিউলি এবং তার দুই প্রেমিক একই উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে মহসিনকে গলা কেটে হত্যা করেন। এরপর তার পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ ধারালো অস্ত্র দ্বারা কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন। মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক শিউলির স্বামীকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

তদন্তের পর শিউলিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। মামলার বিচার শেষে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকার ৪ নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল একমাত্র অভিযুক্ত সালেহা খাতুন শিউলিকে (শিউলি) স্বামী হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। 

 

ওই রায় ও আদেশ অনুমোদনের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারায় বর্তমান ডেথ রেফারেন্স মামলা (১৬৮/২০১৭) হাইকোর্টে নিবন্ধিত হয়। শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে তার আপিল মঞ্জুর করেন।

 

দণ্ডিত শিউলি খাতুনকে অন্য কোনো মামলায় আবশ্যক না হলে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন হাইকোর্ট।

 

কেবল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়; এর সমর্থনে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে হয়। কিন্তু এ মামলায় তদন্তে গুরুতর ঘাটতি ছিল। 

রায়ে বলা হয়, মামলার জন্য মোট সাতজনকে সাক্ষী করা হয়। কিন্তু কেউ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন না। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে এ মামলার বিচারকাজ অগ্রসর হয়। স্বীকারোক্তির সংক্ষিপ্ত সার হলো: স্বামীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিউলি অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। ঘটনার তারিখে দুপুর অনুমান সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে স্বামীর আনা এক বোতল এনার্জি ড্রিংকের সঙ্গে কড়া ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শিউলি তার স্বামীকে পান করান। এরপর ভিকটিম দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন। এই ফাঁকে ঘরে থাকা পশু জবাই করার ছুরি দিয়ে শিউলি তার স্বামীর পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে এবং তার কণ্ঠনালীও কেটে ফেলেন। শিউলির ভাবনা মোতাবেক তার স্বামী তখনো জীবিত ছিলেন মনে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অতঃপর শিউলি স্বেচ্ছায় রক্তে ভেজা তোষক এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিসহ পল্লবী থানায় হাজির হয়ে এই ঘটনা প্রকাশ করেন।

 

তবে সাফাই সাক্ষ্যে শিউলি বলেন, ঈদ উপলক্ষে ২৫ অক্টোবর তিনি তার দুই ছেলেসহ বড় বোনের বাসায় যান। তার স্বামীও সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। বিকেল ৫টায় কোনো এক ব্যক্তি ফোনে জানান যে, মহসিন অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিউলি তার দুই ছেলে, বোন, ভগ্নিপতিসহ হাসপাতালে যান এবং তার স্বামীকে মৃত দেখতে পান। হাসপাতাল থেকে তার স্বামীর লাশ থানায় নেওয়া হয়। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। পুলিশ যেভাবে বলেছে, তিনি সেভাবেই জবানবন্দি দিয়েছেন। বয়ান দেওয়ার সময় পুলিশ কর্মকর্তা হাকিমের সামনেই উপস্থিত ছিলেন। জবানবন্দি পড়ে না শুনিয়ে ধমক দিয়ে সই নেওয়া হয়। তিনি স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে খুন করার মর্মে সাজেশন অস্বীকার করেন।

 

রায়ে উচ্চ আদালত বলেন, কেবলমাত্র স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়। এ নিয়ে অজস্র সিদ্ধান্ত আছে। তবে সব ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে এই স্বীকারোক্তিতে যা বলা হয়েছে সেটা আদালতের কাছে সত্য এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মর্মে প্রতিপন্ন হতে হবে এবং সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র স্বীকারোক্তি নয়, স্বীকারোক্তির বক্তব্য সমর্থন করে এমন স্বাধীন সাক্ষ্য লাগবে। বর্তমান ক্ষেত্রে এরূপ স্বাধীন সাক্ষ্য আনার অনেক সুযোগ ছিল। একটি বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন শক্তসমর্থ পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে তার স্ত্রী বা একজন নারী একাকী তাকে গলা কেটে হত্যাসহ পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারে না, যদি না কেউ তাকে সাহায্য করে থাকে অথবা ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ অচেতন থাকে। ভিকটিমকে যে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়াইয়ে অচেতন করা হয়, এই মর্মে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো সাক্ষী নাই। এমনকি ঘটনার সময় ভিকটিমের পাশে তার একমাত্র স্ত্রী শিউলি খাতুন ছিলেন, আর কেউ ছিল না—এই বিষয়ে আর কোনো সাক্ষ্য নাই। সবকিছুর জন্য আমাদের নির্ভর করতে হবে শিউলির জবানবন্দির ওপর। কিন্তু এক্ষেত্রে যদি ভিকটিমের ভিসেরা পরীক্ষা করা হতো, সেক্ষেত্রে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে তাকে অজ্ঞান করা হয়েছিল কিনা তার প্রমাণ পাওয়া যেত, যা শিউলির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে সমর্থন করতে পারত। 

 

দ্বিতীয়ত, যে প্লাস্টিকের বোতলটিকে জব্দ করা হয়েছে সেটি যে এনার্জি ড্রিংক এবং তার মধ্যে যে চেতনানাশক ওষুধ ছিল, সেই বোতলটিও পরীক্ষা করা হয় নাই। ফলে শিউলির কথিত স্বীকারোক্তির এই অংশ যে সত্য ছিল, সেটি বলার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপক্ষ রাখে নাই। তদুপরি শিউলির বয়ান মোতাবেক ঘটনার পরবর্তী রাতেই পল্লবী থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। অথচ তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করা হয় দুই দিন পর। তার বয়ান রেকর্ড করা হয় ২৯ অক্টোবর। অর্থাৎ এক্ষেত্রে পুলিশি হেফাজত থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টার বেশি তাকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয় এবং নিম্ন আদালতের নথি থেকে দেখা যায় যে শিউলিকে আহত করা হয়েছে। এই বিবিধ কারণে শিউলির কথিত স্বীকারোক্তি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। শিউলি খাতুনের কথিত স্বীকারোক্তি মোতাবেক তার স্বামীর চরিত্রদোষ এবং দীর্ঘদিনের অনৈতিক নারীলিপ্সার কারণে তিনি যারপরনাই ক্ষিপ্ত ছিলেন। কিন্তু ভিকটিম-সংক্রান্ত এই অংশটির প্রতি কোনো সাক্ষীই আলোকপাত করেননি। 

 

আদালত বলেন, শিউলি পূর্বপরিকল্পিতভাবে পানির মধ্যে বেশি পরিমাণ ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে স্বামীকে অজ্ঞান করে প্রথমে রান্নাঘরে রাখা ছুরি দিয়ে স্বামীর পুরুষাঙ্গসহ অণ্ডকোষ কেটে বিচ্ছিন্ন করেন, তারপরে গলা কেটে হত্যা করেন। অথচ সেই ওষুধযুক্ত পানীয়ের শিশি এবং তাতে যে কোনো বিষাক্ত পদার্থ ছিল মর্মে কোনো রাসায়নিক প্রতিবেদন আদালতে আসেনি, যা আশ্চর্য ঘটনা। ফলে আইনত এ কথা বলা চলে না যে, হত্যার পূর্বে ভিকটিমকে কড়া ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। যদি তা না হয়ে থাকে, এমনকি যদি ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েও থাকে, সেক্ষেত্রে একটি বাহিনীর একজন শক্তসমর্থ পুরুষ এই পরিমাণ জখম করা হলো অথচ তার ঘুমই ভাঙল না—এটি স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যায় না। আরও একটি পদ্ধতিগত অনিয়ম হলো, ঘটনাস্থলের থানাতেই মামলার কার্যক্রমের সূত্রপাত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। শিউলি খাতুনের কথিত বয়ান মোতাবেক তিনি নিজেই লাশ বহন করে পল্লবী থানায় যান। অপরদিকে মৃতের ভাই এজাহার করলেও তিনি (২ নং সাক্ষী) আসামির বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য দেননি।

 

সর্বোচ্চ আদালত বলেন, এসব অনিয়ম রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে দৃশ্যতই দুর্বল করেছে। সর্বোপরি প্রসিকিউশনের বক্তব্য মোতাবেক শিউলি নিজেই মৃতের রক্তে ভেজা তোষক এবং রক্তমাখা ছুরি বয়ে নিয়ে থানায় যান, যা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। অথচ তোষকে এবং ছুরিতে লেগে থাকা রক্তের কোনো ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। বরং তদন্তকারী দারোগা বলেন-ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করেন, যা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। 

 

সার্বিক আলোচনায় আমরা এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হতে পেরেছি যে, দণ্ডিত শিউলি খাতুনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আনীত অভিযোগ আইনের ন্যায়দণ্ডে অপ্রমাণিত রয়ে গেছে—রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।


   আরও সংবাদ