ঢাকা, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৬ ১৩:৫০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২০ বার


 প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (৭ জুন) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ শুধু দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি কিংবা দেশের সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অকার্যকর করে দেয়নি, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ অর্জন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যেসব সাহসী মানুষ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানকে সম্মান জানাতে চাইলে আমাদের একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রস্তুত রাখতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।

 

দেশে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।

ইতোমধ্যে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

 

তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমস্যা, সংকট ও প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং শহর কিংবা গ্রামের যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী তাদের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অবাধ প্রসার ও ব্যবহার বর্তমানে মানুষের জন্য নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ব্যবস্থার কারণে অনেক পুরোনো পেশায় কর্মসংস্থান যেমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে কিংবা বিলুপ্ত হয়েছে, একইসঙ্গে নতুন নতুন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব মোকাবিলায় সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বর্তমান সরকার মনে করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ফরেনসিক বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল যোগাযোগ, জ্ঞানীয় সক্ষমতা উন্নয়ন, উপস্থাপনা দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং আর্থিক সচেতনতার মতো দক্ষতাভিত্তিক বিষয়গুলো ছাড়া শিক্ষা কারিকুলাম পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠতে পারে না বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, জেনেটিক প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, শিল্পভিত্তিক ইন্টারনেট অব থিংস, পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক উপকরণ প্রযুক্তি, ন্যানোপ্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তি কিংবা পঞ্চম প্রজন্মের বেতার প্রযুক্তি– আগামী দিনগুলোতে এসব বিষয় সম্পর্কে উদাসীন থেকে কর্মে সাফল্য অর্জন অসম্ভব হয়ে উঠবে।

এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষা কারিকুলামকে বাস্তবভিত্তিক, কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।

গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে শিক্ষা কারিকুলামের পরিমার্জন এবং সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতা উপলব্ধি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ইতোমধ্যেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী, আধুনিক এবং বাস্তবমুখী করার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আজকের এই অনুষ্ঠান তারই বাস্তব প্রতিফলন।

তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিরও প্রধান নিয়ামক। ফলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী করতে শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, শিক্ষানবিশ কার্যক্রম এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংযোগ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই চলমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। তবে একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভরতা, দক্ষতা এবং আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলোর প্রতিও অধিক গুরুত্ব দেবে।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও অনেক শিক্ষার্থী বেকার থাকেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বোচ্চ একাডেমিক সনদ অর্জন করলেও ব্যবহারিক, প্রায়োগিক কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ।

তারেক রহমান বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার শিক্ষানবিশ কার্যক্রম, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায়।

প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ফলে শিক্ষা জীবন শেষে তাদের আর বেকার থাকতে হবে না।

ক্যাম্পাস থেকেই ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরির বহুমুখী উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা’ বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘প্রারম্ভিক তহবিল’ বা ‘উদ্ভাবন অনুদান’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

‘সরকার আশা করে, এর ফলে অনেক আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের ফলে একজন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরও কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।’

শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক-শিক্ষিকারা পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামনে একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন, একইসঙ্গে হবেন সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত এবং পথপ্রদর্শক।

দেশের তারুণ্য এবং ছাত্র-যুবশক্তিকে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য একটি অনুসরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলা এবং ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিখতে পারলে দেশে-বিদেশে কোথাও চাকরির অভাব হবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়। জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা, যোগ্যতা এবং সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জাতীয় উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। এই যাত্রায় বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং শিল্পখাতসহ সকলের সহযোগিতা আশা করে।

দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।

সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা শুধু সনদ প্রদান করবে না, বরং দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করবে, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে এবং জাতীয় সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। শিক্ষা শুধু চাকরিজীবী তৈরি করবে না, বরং সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি নির্মাণ করবে এবং জাতীয় সমৃদ্ধিকে আরও বেগবান করবে।

অনুষ্ঠানে ‘কর্মমুখী শিক্ষা নেব, বিশ্বজুড়ে কাজ করব’ প্রতিপাদ্যে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা।

পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।


   আরও সংবাদ