ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮ জুন, ২০২৬ ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৭ বার
দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়ায় স্বস্তির হাওয়া বয়ে যাচ্ছে হরমুজ প্রণালীতে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত এই জলপথ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের উদোক্তারা।
জানা গেছে, গত ১৬ জুন সংঘাতে লিপ্ত দুই দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার ইঙ্গিত আসে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) যুদ্ধবন্ধের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আভাস দিয়েছে।
পরে এই সমঝোতার কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী চালুর ঘোষণা দিয়ে বিশ্বের জাহাজগুলোকে ‘ইঞ্জিন চালু’ করতে বলার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্বস্তির আবহ নামিয়ে এনেছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রণালীর দূরত্ব অনেক বেশি হলেও অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক। কেননা বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রা উপার্জনের সবচেয়ে বড় খাত রপ্তানিশিল্প এই প্রণালীর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগই এই প্রণালী দিয়ে জাহাজে করে ক্রেতার হাতে পৌঁছায়। আবার এই প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহসহ অন্যান্য কাঁচামাল-আমদানি রপ্তানি স্বাভাবিক থাকলে তা দেশের শিল্পখাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিক ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, তাতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কোণঠাসা করতে সেখানে অবরোধ জারি করলে স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক চাকা। সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ ব্যবস্থা) ভেঙে পড়ায় জ্বালানি সংকট এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতিতে হাঁসফাঁস করছিল উন্নত থেকে শুরু করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো।
স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের প্রতীক্ষা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার খবরে এই বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে আবার নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় দিন গুনছে বিশ্ববাসী। ব্যবসায়ী মহল এখন চুক্তি শতভাগ বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রতীক্ষা করছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর এতদিনের স্থবিরতার কারণে শিপিং লাইনের দীর্ঘ সময় লাগছে এবং বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। এতে প্রকৃত রপ্তানি আয় কমছে।
দেশের নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলানিউজকে বলেন, ‘এই চুক্তিটি যদি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়ে যায় এবং যুদ্ধ যদি স্থায়ীভাবে থেমে যায়, তবে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে যে বিশাল অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকেন্দ্রিক অস্থিরতার মধ্যে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা যে মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।’
তিনি বলেন, ‘এতদিন মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে আমাদের ইউরোপগামী জাহাজগুলি স্বাভাবিক রুট দিয়ে সরাসরি যেতে পারছিল না। আফ্রিকার ওদিক দিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে, অতিরিক্ত সময় ও বিপুল পরিমাণ বাড়তি ভাড়া গুনে আমাদের পণ্য পাঠাতে হতো। চুক্তিটি হলে জাহাজগুলো আবার স্বাভাবিক রুটে ফিরবে, যা আমাদের লিড টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) এবং পরিবহন খরচ দুই-ই কমিয়ে আনবে।’
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘বিশ্ববাজারে তেলের যে তীব্র সংকট বা জ্বালানি তেলের যে চরম অস্থিরতা চলছিল, এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার স্থায়ী সমাধান হবে। বিগত কয়েকমাস ধরে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি যে টালমাটাল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা এই সমঝোতার হাত ধরে একটি কাঠামোগত শৃঙ্খলায় চলে আসবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে একটি বোমা বিস্ফোরণ হলে বা সামান্য উত্তেজনা ছড়ালে তার চড়া মূল্য দিতে হয় বাংলাদেশকেও। কারণ এতে উত্তর আমেরিকাসহ সর্বত্র জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। আর পশ্চিমা ক্রেতাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই তারা পোশাক কেনার বাজেট কাটছাঁট করে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের তৈরি পোশাকের কার্যাদেশের ওপর।’
বিশ্ববাজারে দাম কমেছে জ্বালানির, দেশেও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্য প্রয়োজনীয় মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল ও সিংহভাগ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে, ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও পরিবাহিত জ্বালানির একটি প্রধান অংশ সারা পৃথিবীতে সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি চূড়ান্ত ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা কেটে যাবে এবং জ্বালানি তেলের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান ঘটবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করবে।
ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ব্যারেল ১০০ ডলার থেকে কমে বিক্রি হচ্ছে ৮৪ ডলার করে। এদিকে ইউএস ট্রেড অয়েল কমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ আর বিক্রি হচ্ছে ৮১ ডলার করে।
তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। কম দামে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পাওয়ার কারণে দেশের ভারী কলকারখানা পরিচালনা, টেক্সটাইল মিল ও উৎপাদনমুখী শিল্পের চাকা সচল রাখা সহজ হবে। এছাড়া বাংলাদেশের কৃষি খাতের একটি বড় অংশ সেচ কাজের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন খরচ কমলে বিদ্যুৎ ও সেচের ব্যয় কমবে, যার ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। একই সঙ্গে প্রভাব পড়ে দেশে মূল্যস্ফীতিতে। তবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা আগামী শুক্রবারের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার একটি আভাস পাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় কমে এলে দেশের বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
পোশাক খাত, রেমিট্যান্স, রিজার্ভ ঘিরেও আশাবাদ
পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছিল। যার ফলে সেখানকার ভোক্তারা বিলাসবহুল বা অ-দরকারি পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। সম্প্রতি সমঝোতার আভাস পাওয়ায় পশ্চিমা বাজারে বড় পরিবর্তন ঘটবে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত—তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ আবার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। শুধু পোশাক খাতই নয়, পশ্চিমা বাজারের এই সুবাতাসের কারণে দেশের চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, ওষুধ এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাণিজ্যও নতুন করে গতিশীল হবে।
একইভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়বে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমে আসবে বলেও মনে করছেন তারা।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশ বেশি ডলার খরচ করে জ্বালানি কিনতে হয়। এর ফলে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসবে।
ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো হরমুজ প্রণালীর অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। যুদ্ধাবস্থা ও অনিশ্চয়তা কেটে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে। এর ফলে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় সতর্কতারও তাগিদ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল অবশ্য মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি আনলেও বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান এবং হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতির সঞ্চার হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। হরমুজ সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল সরবরাহে যে তীব্র বিঘ্ন ঘটেছিল, তা স্বাভাবিক হলে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং বিশ্ববাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে।’
তবে এই স্বস্তির খবরের মধ্যেও তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী বিষয়ে আলোকপাত করেন। মহিউদ্দিন রুবেল সতর্ক করে বলেন, “সংকট সাময়িকভাবে কেটে গেলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত ধরনের কারণে গত কয়েক বছরে যে দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্ষত’ বা কাঠামোগত ক্ষতি তৈরি হয়েছে, তা কিন্তু রাতারাতি মুছে যাবে না। সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।”
তিনি বলেন, ‘একটি বড় ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু শান্ত মনে হলেও রাস্তাঘাট কিন্তু আগের মতো মসৃণ বা অক্ষত থাকে না; সেখানে ফাটল থেকে যায়। ঠিক তেমনি, বিগত কয়েক বছরের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি যেভাবে ব্যাহত হয়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা ক্ষত থেকে গেছে। এই ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতিকে পুরোপুরি আগের জায়গায় ফিরতে সময় লাগবে।’