ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

পাল্টাপাল্টি হামলায় শান্তিচুক্তি হুমকির মুখে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৯ জুন, ২০২৬ ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৮ বার


 পাল্টাপাল্টি হামলায় শান্তিচুক্তি হুমকির মুখে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে এমন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে যাতে ‘ইরানের আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না’।

 

রোববার দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাবে তেহরান বাহরাইন ও কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা পুরোপুরি স্থগিত করারও হুমকি দেয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, খুব শিগগির এমন সময় আসতে পারে যখন তিনি আলোচনার পথ ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সামরিকভাবে কাজ শেষ করতে’ নির্দেশ দেবেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘যদি তা-ই হয়, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

 

যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক ঘাঁটি থাকা কুয়েত রোববার জানায়, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে কেউ নিহত হয়নি।

 

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে ‘সামরিক অভিযানের’ সময় ছিটকে আসা ধাতব টুকরোর আঘাতে এক কাতারি নাগরিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। তারা একটি নৌকায় ছিলেন, যা শনিবার নিখোঁজ হওয়ার পর রোববার সকালে উদ্ধার করা হয়।

তবে মন্ত্রণালয় ঘটনাস্থল বা ওই ধাতব টুকরো ইরানের ড্রোন হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।

রোববার গভীর রাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সংঘাত বন্ধ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সব বিষয়েই কারিগরি আলোচনা চলবে। আপাতত উভয় পক্ষই হামলা বন্ধ রাখবে এবং জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারবে।’

এ মাসের শুরুতে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে এই আলোচনা চলছে।

সাম্প্রতিক সহিংসতার মূল কারণ, হরমুজ প্রণালীকে ইরানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য খুলে দেওয়ার উদ্যোগ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহকারী এই কৌশলগত জলপথ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচিত।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানের অব্যাহত আগ্রাসনের জবাব হিসেবে তারা নজরদারি, যোগাযোগ, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন সংরক্ষণ ও সমুদ্রে মাইন পাতা-সংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

ওয়াশিংটন ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ করিডোর ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে তেহরান চায় জাহাজগুলো তাদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর করিডোর ব্যবহার করুক, যাতে ভবিষ্যতে সেখান থেকে ফি আদায় করা যায়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় উপসাগরে শত শত তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজ আটকা পড়ে। তবে গত দুই সপ্তাহে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, শনিবার পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ কিকু-তে হামলা চালিয়ে ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানির জন্য অপরিশোধিত তেল বহনকারী জাহাজটি ওমান উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণ করিডোর ব্যবহার করছিল।

গত সপ্তাহে একই পথে চলাচলকারী সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজেও ইরানের ড্রোন আঘাত হানে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার ইরাক সফরে গিয়ে পুনর্ব্যক্ত করেন, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র ইরানের হাতেই থাকা উচিত।

বাগদাদে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কিংবা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে নতুন কোনো ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হতে দেরি করবে এবং উত্তেজনা আরও বাড়াবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করতেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোকেও প্রভাবিত করে অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালীকে ব্যবহার করছে।

আরাগচি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উপস্থিতি থাকবে না।

তার ভাষায়, ‘অঞ্চলের বাইরের কোনো দেশের উপস্থিতি বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই আমাদের এমন একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় পৌঁছাতে হবে, যেখানে এই অঞ্চলের সব দেশ থাকবে।’

কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ মাসের শুরুতে সুইজারল্যান্ডে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হলেও হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ রয়ে গেছে।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এসব বিষয়ে সমাধানে দুই দেশের হাতে ৬০ দিন সময় রয়েছে।

দেশীয় রাজনৈতিক চাপের কারণে আপাতত উভয় দেশই যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে আগ্রহী হলেও উসকানিমূলক বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) রোববারের হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, ‘শত্রুকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হলে চলমান সব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।’

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণকারী আইআরজিসির নৌবাহিনীও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে।’

বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক উত্তেজনা’ বলে অভিহিত করেছে।

তাদের ভাষ্য, ‘তেহরানের কর্মকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাজ্যের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক আগ্রাসনের অংশ।’

উল্লেখ্য, বাহরাইনেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা যুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার হামলার মুখে পড়ে।

লেবাননেও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আরও চাপের মুখে পড়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের দেইর সেরিয়ান এলাকায় সন্দেহজনক একটি স্থাপনায় প্রবেশের সময় হিজবুল্লাহর এক যোদ্ধার মুখোমুখি হয়ে এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের দেইর সেরিয়ান ও তাইবেহ শহরের উপকণ্ঠেও নতুন করে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে।

এই নতুন সংঘর্ষ এমন এক সময় ঘটল, যখন মাত্র দুই দিন আগে ইসরায়েল ও লেবানন শত্রুতা বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবানন থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করে সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন হওয়ার কথা। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামোও ভেঙে ফেলার কথা রয়েছে।

তবে এসব সংঘর্ষ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো স্থায়ী সমঝোতাও সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালাতে গত মার্চে দক্ষিণ লেবাননে অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন একাধিকবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা ছিল সীমিত। ইসরায়েল দখল করা এলাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে, আর হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি সেনা অবস্থান বজায় থাকা পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে।


   আরও সংবাদ