ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:১৭ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
চট্টগ্রাম: বায়ু দূষণের দিক থেকে নবম অবস্থানে বন্দরনগর চট্টগ্রাম। আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ‘অনেক ভালো’ বলে বিবেচিত হয়।
৫১ থেকে ১০০ হলে ‘মাঝারি বা সহনীয়’, ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ এবং ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচনা করা হয়।
এ ছাড়া স্কোর ৩০১-এর বেশি হলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এই মান ২৩১।
ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) গবেষণা বলছে, বায়ু দূষণের কারণে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের ৪৮ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের মানুষ।
ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) চট্টগ্রাম শহরের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রতিপালনের অবস্থা শীর্ষক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ২৮২টি সরকারি অফিসের মধ্যে ৫৪ শতাংশ, ৪২৩টি রেস্টুরেন্টের মধ্যে ৫০ শতাংশ, ১২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪১ শতাংশ এবং ১৮৭টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মধ্যে ৩৪ শতাংশে ধূমপানের প্রমাণ মিলেছে।
শহরে চলাচলকারী ৪১৯টি সিটি বাসে অনুসন্ধানে ৮৫ শতাংশে ধূমপান করতে দেখা গেছে। ধূমপানকারীদের মধ্যে ৯৮ শতাংশই চালক ও সহকারী, দুই শতাংশ যাত্রী।
অপরদিকে ঘরের ভেতর কয়লা, কেরোসিন, গোবরের ঘুঁটে আর কাঠ-লাকড়ি দিয়ে চুলায় রান্নার কারণে অতিসূক্ষ্ম কণা, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বনডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, বেনজিন, বিউটাডাইন, ফরমালডিহাইড, পলিঅ্যারোমেটিক হাইড্রো-কার্বনসহ অনেক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে।
এমন দূষণের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসে ক্যানসার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি রোগে ও শ্বাসজনিত সংক্রমণে মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২ লাখ ৩৭ হাজার শিশু ঘরের ভেতরে এভাবে রান্নার কারণে মারা যাচ্ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে ফুসফুসের রোগ।
চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার মূল কারণ ধূমপান ও বায়ু দূষণ। এর ফলে বাড়ছে অকাল মৃত্যু। তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার ফুসফুসের ক্যান্সার, সিওপিডি, যক্ষ্মা ও অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ধুলাবালি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্য অ্যালার্জেনের চেয়ে ধুলা খুব সহজে নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। ফলে খুব দ্রুত সর্দি-কাশি এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুর শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে দুটি হলো-ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ।
এমন প্রেক্ষাপটে ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ এবং সুস্থ ফুসফুসের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফুসফুস দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘এ লাইফটাইম অব লাং হেলথ’।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, ভেপিং ও নিকোটিন পাউচের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা ব্যক্তিগত চেম্বারে এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকে এমন রোগীও প্রায়ই পাচ্ছেন-যারা স্যাঁতসেতে পরিবেশে থাকার কারণে ফুসফুসে সংক্রমণের শিকার হচ্ছে।
সাধারণত বুকে কফ জমলে কিংবা কাশি হলে ধারণা করা হয়- ফুসফুসে সমস্যা হয়েছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কাশি না হলেও ফুসফুসে বাসা বাঁধতে পারে একাধিক কঠিন রোগ। অ্যাজমা, সিওপিডি, পালমোনারি ফাইব্রোসিস থেকে শুরু করে ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগও কাশি ছাড়াই শরীরে নীরব ঘাতক হিসেবে দেখা দেয়। পরোক্ষ ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার শ্বাসযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
চমেক হাসপাতালে গত এক বছরে ফুসফুসের সমস্যায় চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ৯০ শতাংশই ছিলেন ধূমপায়ী। ১০ শতাংশ পরোক্ষ ধূমপায়ী। এছাড়া দূষণে আক্রান্ত শিশু পাওয়া গেছে, যারা চুলার ধোঁয়া গ্রহণ করেছে প্রতিদিন।
ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে গেলে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিন ধরে কাশি, শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ফুসফুসের কার্যকারিতা দেখতে পালমোনোলজিস্টরা স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
পালমোনোলজিস্ট ডা. ইব্রাহিম খলিল জানান, ধুলা হাঁপানির জন্য ক্ষতিকর। এতে মাইট, ফুলের রেণু, তুলার আঁশ, পোষা প্রাণীর লোম, ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন প্রকার ছত্রাক মিশে থাকে। মাইটের শরীর থেকে নির্গত মল, লালা ও রস ধুলার সঙ্গে মিশে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করে অ্যালার্জির সৃষ্টি করে। ধুলাজনিত অ্যালার্জির কারণে অ্যাজমা রোগীর পরিমাণ বেশি। গ্রামের তুলনায় শহরের বেশিরভাগ লোক এ রোগে আক্রান্ত হয়।
তাই ফুসফুস বাঁচাতে ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলতে হবে। ঘর ঝাড়ু দেওয়া এবং বিছানা পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। মাইট বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ যাতে সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের মতামত ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন পালমোনোলজিস্টরা।