ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৯:৫৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫৯ বার


জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ

বন বিভাগে ডেপুটি রেঞ্জার থেকে রেঞ্জার পদে পদোন্নতিতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। সিনিয়রদের উপেক্ষা করে পছন্দের ২৮৯ জন ডেপুটি রেঞ্জারকে রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বন অধিদপ্তরের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গত ২১ ডিসেম্বর প্রধান বন সংরক্ষক ২৮৯ জন ডেপুটি রেঞ্জারকে রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিতে কর্মকমিশনে সুপারিশ পাঠাতে চিঠি দেন বন সচিবকে।

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠতার তালিকা গোপন, সিনিয়রকে জুনিয়র বানিয়ে জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত এবং বিভাগীয় মামলা দিয়ে সিনিয়র ফরেস্টারদের জুনিয়র বানিয়ে ঘায়েল করার অভিনব কৌশল খাটানোর অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

 

বৈষম্যের শিকার কর্মচারীদের অভিযোগ, পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য হওয়ায় বন সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অথচ এসব অভিযোগের তদন্ত তো দূরের কথা অভিযোগ আমলেই নেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীরা জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে দুর্নীতি চিহ্নিত করে কর্মকমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন।

ভুক্তভোগী কর্মচারীরা বলেন, উচ্চ আদালতে অবকাশকালীন সময় চলছে।

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে পদোন্নতি বঞ্চিত ফরেস্টার এবং গ্রেডেশনে অনিয়ম করে জুনিয়র বানানো সিনিয়র ডেপুটি রেঞ্জারদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আইনি লড়াই করার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ন্যায্য দাবিগুলোর সুরাহা না করে ডেপুটি রেঞ্জার থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পদে পদোন্নতি না দিতে বন উপদেষ্টা, কর্মকমিশন চেয়ারম্যান ও বন সচিবের হস্তক্ষেপ চাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত বন কর্মচারীদের মধ্যে (স্মারক নং: ১৫৮৪) ৪৫৪ জন ফরেস্টারকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি প্রদান করে একটি আদেশ জারি হয়।

ওই আদেশে মৃত ব্যক্তিকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়। ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিতে বিযয়টি ধরা পড়ার পর বন বিভাগ সেটি তড়িঘড়ি করে সংশোধন করে। অথচ বিভাগীয় পদোন্নতি সংক্রান্ত কমিটির এই ধরনের দায়সারা সুপারিশ জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। পদোন্নতি কমিটি পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সার্ভিস বই, তাদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) যাচাই বাছাই করার পরে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করার বিধান রয়েছে। যেকোন সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারিদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করে মাঠ পর্যায়ে পাঠানোর বিধান থাকলেও বন বিভাগে সম্প্রতি পদোন্নতির ক্ষেত্রে সেটি উপেক্ষা করা হয়েছে।

ফরেষ্ট রেঞ্জার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ডেপুটি রেঞ্জারদের খসড়া বা চূড়ান্ত গ্রেডেশন তালিকা ও সুপারিশনামা বন বিভাগের ওয়েরসাইটে প্রকাশ না করে মাঠ পর্যায়ে সেটি গোপন করে বন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।

 

অনুসন্ধান বলছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে (বন অধিদপ্তরে স্মারক নং: ১০৭৯) ৮৭৮ জন ফরেস্টারের গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে এই তালিকা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সংশোধনের জন্য বন সচিবের কাছে আবেদন করেন ভুক্তভোগীরা। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে  বন মন্ত্রণালয় থেকে (স্মারক নং: ৫১০) চলতি বছরের ২১ অক্টোবর বন অধিদপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। যদিও পরবর্তীতে বন অধিদপ্তর দায়সারা ব্যাখ্যা প্রদান করে বন মন্ত্রণালয়ে। অন্যদিকে, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির তারিখ সংশোধনের জন্য কয়েকজন ডেপুটি রেঞ্জার প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে আবেদন করলেও তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অদ্যবধি কোনো সাড়া দেওয়া হয়নি।

পদোন্নতি প্রাপ্তদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪৫৪ জনের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির তারিখ বিগত ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ না দেখিয়ে বিভিন্ন তারিখে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে চাকরিতে সিনিয়র অনেকেই জুনিয়র হয়ে গেছেন। অনেকের ১২-১৬ বছর সরকারি চাকরিতে কর্মকাল আমলে না নিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। মূলত, ২৮৯ জন ডেপুটি রেঞ্জারকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদোন্নতি দিতে অভিনব ছলচাতুরির কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধ। ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে প্রাপ্তির তারিখ থেকে যোগ্য বা যেই সময় থেকে প্রাপ্য সেই সময় প্রদান করার বিধান থাকলেও সেটি মানা হয়নি। পদোন্নতির তালিকায় থাকা মো. মাসুম কবিরের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির তারিখ লেখা হয়েছে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। অথচ গ্রেডেশন তালিকায় দেখা যায় তার চাকরিতে যোগদান কাল ২০০০ সালের ২৪ মে। সরকারি চাকরিতে তার কর্মকাল ২০ বছরের বেশি হলেও তাকে সিনিয়র না দেখিয়ে জুনিয়র দেখানো হয়েছে। তার মতো কপাল পুড়েছে এমন আরও অনেকের।

পদোন্নতির তালিকার ১-১৯ নম্বর ক্রমিকে উল্লেখিত ডেপুটি রেঞ্জাররা সরাসরি রাজস্বখাতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে বিগত ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে ফরেস্টার পদে যোগদান করেন। ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের পদোন্নতি ২০০৫ সালে উল্লেখ করার কথা থাকলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিগত ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর। এর মধ্যে কয়েকজনকে আবার ভিন্ন ভিন্ন তারিখে পদোন্নতি দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ বন বিভাগে ২০১৪ সালে যোগদান করা ৬২ জন ফরেস্টারকে বিগত ২০২০ সালে ভূতাপেক্ষভাবে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাদের চাকরিকাল মাত্র ৬ বছর। অপরদিকে, ২০০০ সালে সরাসরি রাজস্বখাতে যোগদান করা ফরেস্টারদের চাকরিকাল একই সময় ২০ বছর অতিক্রম করেছে। পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বন অধিদপ্তরে ফরেস্টার থেকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি প্রদানে অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলা দায়েরের বিষয়গুলো বন অধিদপ্তর, সচিবালয় এবং সরকারি কর্মকমিশনকে অবহিত করার পরেও বন অধিদপ্তরে ডেপুটি রেঞ্জার থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পদে ৪১১ জনের  তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।

এ ব্যাপারে জানতে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন দিলে কৌশলে তারা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো. মইনুদ্দীন খান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাব যেভাবে যাওয়ার কথা সেভাবেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী কাজ করবে মন্ত্রণালয়। আমরা শুধু একটি মিটিং করে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। বন সংরক্ষক (প্রশাসন ও অর্থ) আর. এস. এম. মুনিরুল ইসলাম বলেন, পদোন্নতির জন্য কমিটি করা হয়েছে তারাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপবন সংরক্ষক (পরিকল্পনা উইং) শেখ আবু তৌহিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি সংস্থাপন শাখায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

তবে বন সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ ও প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরকে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি।


   আরও সংবাদ