ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১ জানুয়ারী, ২০২৬ ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫৯ বার
‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও? তারি প্রবাহ নিত্য উধাও।’ ঠাকুরের এই অমোঘ পঙ্ক্তি যখন ইতিহাসের জীর্ণ পাতায় প্রতিধ্বনিত হয়, তখন হৃদস্পন্দনে বেজে ওঠে এক অপরাজেয় সংগ্রামের বিষাদময় সুর। তিনি কোনো সাধারণ মানবী নন, বরং এক অবরুদ্ধ জাতির কণ্ঠস্বর—বেগম খালেদা জিয়া। সময়ের নিষ্ঠুর চাকা যখন আবর্তিত হয়, তখন তা যেমন প্রতাপশালী সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করে, তেমনি গড়ে তোলে এমন কিছু অবিনশ্বর চরিত্র যারা ইতিহাসের চেয়েও মহিমান্বিত।
তার সেই দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ অভিযাত্রার দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন সেই মহাযানের যাত্রী, যার গন্তব্য কোনো পার্থিব ভূখণ্ড নয়, বরং এক জাতির মুক্তি ও আত্মপরিচয়। মহাকালের আবর্তে কত অহংকার চূর্ণ হয়, কত উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়ে অজানায়, কিন্তু কিছু নাম থেকে যায় চক্রে পিষ্ট আধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন হয়ে—যা ঘোর অমানিশাতেও পথহারা পথিককে আলোর দিশা দেখায়।
১.
দিনাজপুরের সেই শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তরুণীটি হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি যে, তার ললাটে খোদাতায়ালা লিখে রেখেছেন এক বিশাল জাতির ভাগ্যবিধাতার গুরুভার। মরমী গদ্যে বললে—কিছু নদী যেমন অখ্যাত পাহাড়ের গুহায় জন্ম নিয়ে ধীর লয়ে সাগরের বিশালতার দিকে ধাবিত হয়, তার জীবনও ছিল ঠিক তেমন এক শান্তপ্রবাহ।
একজন নির্ভীক সেনাপতির জীবনসঙ্গিনী হিসেবে তিনি যখন সেনানিবাসের নিভৃত কোণে নিজের সংসার সাজাতেন, তখন তার সেই মমতা ছিল ভোরের শিশিরভেজা ঘাসের মতো স্নিগ্ধ। যেন কোনো নিভৃত পল্লীর শান্ত সরোবর, যেখানে কেবল প্রশান্তির জলসা বসে। সেই সময়কে মনে করিয়ে দেয় অমর সেই আহ্বান—
শান্তির ললিত বাণী শুনিব কি এ পোড়া জীবনে / যদি না তোমার ছায়া ছড়ায় এ বুকের আঙ্গনে।
কিন্তু মহাকাব্যের অলঙ্ঘনীয় বিধানে যেমন নায়িকার ভাগ্য বারবার নিষ্ঠুর মোড় নেয়, তার জীবনেও এলো সেই প্রলয়ঙ্করী বজ্রপাত।
১৯৭১-এর বন্দিত্ব থেকে শুরু করে ১৯৮১-তে প্রিয়তম স্বামী শহীদ জিয়ার শাহাদাত বরণ—প্রতিটি আঘাত তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক অনিশ্চিত তিমিরে। কিন্তু তিনি জানতেন, মর্ত্যের সাধারণ মৃত্তিকা দিয়ে যদি অবিনশ্বর অমৃতমূর্তি গড়তে হয়, তবে দহনজ্বালা সইতেই হয়।
শহীদ জিয়ার সেই বিশাল ছায়া যখন হঠাৎ করে বাংলার আকাশ থেকে সরে গেল, তখন তিনি কেবল এক বিধবা নারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক আদর্শের একমাত্র আমানতদার। সেই শোকের দিনে তিনি একাই আগলে রেখেছিলেন সেই দীপশিখা, যা নেভানোর জন্য চারদিকে বইছিল কালবৈশাখী ঝড়। তার সেই নিঃসঙ্গতা ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার মতো, যেখানে কেবল বিচ্ছেদ নয়, বরং এক জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছিল।
২.
সেই ধাবমান কাল যখন কোনো অমোঘ সংকেতে আমাদের জীবনের শান্ত দিঘিতে নিষ্ঠুর ঢিল ছোড়ে, তখন মুহূর্তেই পাল্টে যায় সব দৃশ্যপট। বেগম জিয়া—যিনি ছিলেন এক শান্তিনিবাসের সলজ্জ গৃহবধূ, তাকে মহাকাল তুলে নিল তার উত্তাল কালপ্রবাহে। সেই যাত্রা ছিল অনিশ্চয়তার, সেই রাজপথ ছিল রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ মরুভূমি। স্বামী হারানোর গভীর শোককে তিনি যখন হিমালয়সম শক্তিতে রূপান্তর করে রাজপথে নামলেন, তখন তিনি আর কেবল কোনো একক নারী রইলেন না; তিনি হয়ে উঠলেন এক অবরুদ্ধ জাতির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের সেনানী।
সেই বিষাদময় বিদায়লগ্নে তিনি হয়তো মনে মনে আওড়েছিলেন—তোমা হতে বহু দূরে। মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম। প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি কারাবরণ ছিল তার কাছে এক-একটি ক্ষুদ্র প্রয়াণ। ১৯৮২ থেকে শুরু হওয়া সেই দীর্ঘ দহনের প্রতিটি দিন ছিল প্রজ্জ্বলিত আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার সেই আপসহীন শৌর্য তাকে এনে দিয়েছিল ‘দেশনেত্রী’র মুকুট। রাজপথের প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে আছে তার সেই অবিচল পদচারণার, যেখানে টিয়ার গ্যাস আর লাঠিচার্জের মুখেও তিনি ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। আজ হয়তো পরিবর্তনের স্রোতে সময় অনেক দূর বয়ে গেছে, কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ আয়নায় আজও সেই অপরাজেয় মুখচ্ছবি অমলিন নক্ষত্রের মতো ভাস্বর।
৩.
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন, তখন তার সামনে ছিল এক ভগ্নস্তূপের ওপর নতুন প্রাসাদ গড়ার কঠিন প্রত্যয়। তিনি কেবল ক্ষমতা চর্চা করেননি, তিনি এই দেশের গৃহবন্দী নারীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মুক্তির কলম। বিনা বেতনে নারী শিক্ষার প্রবর্তন ছিল তার এক কালজয়ী বিপ্লব, এক নীরব সমাজ বদলের ইশতেহার। তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের কন্যারা যেন কুসংস্কারের ঘোর আঁধার থেকে বেরিয়ে প্রদীপ্ত সূর্যের আলোয় অবগাহন করে। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ ফিরে পেয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের হারানো অধিকার। 'মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই, শূন্যেরে করব পূর্ণ'—এই অদম্য স্পৃহায় তিনি রিক্ত দেশে আশার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিলেন।
তার শাসনামলে উন্নয়নের যে ধারা সূচিত হয়েছিল, তা কেবল ইট-পাথরের দালানকোঠা নয়, বরং মানুষের অন্তরের মুক্তির ইশতেহার। পল্লী বিদ্যুতায়ন থেকে শুরু করে যমুনা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্পের সাহসী সূচনা—সবকিছুতেই ছিল তার সেই দেশপ্রেমের অমলিন স্বাক্ষর। তিনি বিশ্বাস করতেন, এদেশের মাটি ও মানুষ যদি একবার জেগে ওঠে, তবে কোনো পরাশক্তিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। তার সেই আত্মবিশ্বাস আজ আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪.
ঘোর অমানিশায় দিগভ্রান্ত জাহাজ যেমন ধ্রুবতারা দেখে পথ চিনে নেয়, তেমনি বাংলাদেশের অধিকারহারা মানুষ পথ চিনেছে বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে। যখন মেঘাচ্ছন্ন আকাশে গণতন্ত্রের পাল ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন তার সেই আপসহীন বজ্রকণ্ঠই ছিল সাধারণের একমাত্র ধ্রুবতারা। তিনি ছিলেন সেই ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’, যিনি একাকীত্বের সুউচ্চ হিমালয় জয় করতে দ্বিধাহীনচিত্তে এগিয়ে যেতেন। তার অটল সাহস দেখে কোটি কোটি মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনত। ইতিহাসের সেই কঠিন সন্ধিক্ষণে তার অস্তিত্ব ও সংগ্রামকে যেন ব্যক্ত করে এক মরমী উচ্চারণ— ‘আমার চেতনা যেন একটি সাদা গোলাপ / যার প্রতিটি পাপড়িতে তোমার নামের সুবাস।’
যখন তিনি একাকী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বা নিঃসঙ্গ অবস্থায় লড়াই করেছেন, তখন সেই মুহূর্তের গাম্ভীর্য প্রতিফলিত হয় এক তিমির-বিদারী শৌর্যে—পরাজিত নই আমি, আমার ললাটে বিজয়ের তিলক আঁকা / একাকী লড়িছি তিমিরে, তবুও আমার আকাশ সূর্য-মাখা। ২০০৭-এর সেই অন্ধকার সময়ে যখন অনেক দীপ্ত প্রদীপ নিভে গিয়েছিল, তখনও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন পাহাড়ের মতো অবিচল। নিজ দেশ ত্যাগ করার প্রলোভন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছিলেন—‘এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমার শেষ শয়ান’।" এই একবাক্যেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, কোনো বিদেশি শক্তির কাছে বাংলার স্বাতন্ত্র্য তিনি বিকিয়ে দেবেন না।
৫.
জীবনের শেষ দশকে তিনি যখন কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত হলেন, তখন সেই নিঃসঙ্গতা ছিল এক নির্মম ট্র্যাজেডির মতো। জরাজীর্ণ দালানের নির্জন কক্ষে তিনি যখন প্রহর গুনতেন, তখন তার মনে পড়ত হয়তো সেই দিনগুলোর কথা, যখন লক্ষ জনতা তার এক ইশারায় রাজপথে নেমে আসত। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গতা তাকে ম্লান করতে পারেনি। বরং কারার ওই লৌহকপাট তার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছিল। তিনি ছিলেন সেই ‘বন্দী রাজলক্ষ্মী’, যিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল পরলেও মনে মনে ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতীক।
অসুস্থ শরীরেও তিনি যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে লড়ছিলেন, তখন তার সেই ললাট ছিল এক অপরাজেয় ইশতেহার। তিনি জানতেন, সত্যের পথ কন্টকাকীর্ণ, কিন্তু সেই পথই শেষ পর্যন্ত মুক্তির বন্দরে পৌঁছে দেয়। তার সেই কারাবরণ ছিল এই দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক মরমী প্রতিবাদ। আল-মাহমুদের ভাষায়—“যে মানুষটি মাটির প্রেমে নিজেকে সঁপে দেয়, তার জন্য পৃথিবীর কারাগার কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী সরাইখানা”।
৬.
বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান সংবাদ যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তা কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বনেতৃত্বের কণ্ঠে সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল এক মহান যোদ্ধার প্রতি অকুণ্ঠ সম্মান। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস তার শোকবার্তায় গভীর মমতায় বলেছিলেন, “তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের এক অনন্য ধ্রুবতারা। তার সংগ্রাম কেবল রাজনীতির জন্য ছিল না, তা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদাবোধের জন্য। বেগম জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের জাতীয় জীবনে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা সহস্র বছরেও পূর্ণ হওয়ার নয়।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শোকের ছায়া হয়েছিল গভীরতর। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বেগম জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “তার সাহসী নেতৃত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে”। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, “তিনি ছিলেন এক আপসহীন কণ্ঠস্বর, যিনি সব বাধা উপেক্ষা করে মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে আজীবন লড়াই করেছেন।” ড. ইউনুস আরও যোগ করেন, “তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে শিরদাঁড়া সোজা রেখে অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যেতে হয়”। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সৌদি আরবের রাজপরিবার—সবার চোখে মুখে উদ্ভাসিত হয়েছে এক মহান মুসলিম নেত্রীর বিদায়ে গভীর বিষাদ।
৭.
বিদায়ের সেই করুণ প্রহর যখন ঘনিয়ে এলো, আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে বেজে উঠল বিউগলের বিষাদ সুর। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তখন এক নিঃসঙ্গ রাজপুত্র—তারেক রহমান। জননীর শীতল মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে তার সেই আরক্ত অশ্রুসিক্ত চোখ যেন এক মহাকাব্যিক শোকের প্রতিচ্ছবি। যে জননী দীর্ঘ লড়াইয়ের দিনগুলোতে ছিল তার একমাত্র দুর্ভেদ্য আশ্রয়, সেই আশ্রয় আজ নিস্পন্দ, নীরব। প্রবাসের ধূলি মেখে ফিরে এসে জননীর নিথর কফিন স্পর্শ করার সময় তার সেই কান্নায় মনে হচ্ছিল, মহাকালের কোল থেকে একটি নক্ষত্র চিরতরে খসে পড়েছে। লাখো মানুষের সাগর ঠেলে জননীর কফিন কাঁধে নিতে নিতে তিনি যখন শূন্যের পানে তাকালেন, তখন সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো রাজনৈতিক দম্ভ, ছিল কেবল এক অনাথ সন্তানের আকাশছোঁয়া হাহাকার।
তারেক রহমানের সেই অশ্রু আজ কেবল ব্যক্তিগত শোক নয়, তা এক জাতির বিদীর্ণ হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি যখন তার গর্ভধারিণী মাকে কবরের গহ্বরে শুইয়ে দিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল বাংলার মাটিই আজ তার একমাত্র শেষ আশ্রয়। জননীর আদর্শ আর সংগ্রামের সেই বিশাল বোঝা আজ তার কাঁধে, যা বয়ে নিয়ে যেতে হবে আগামীর দুর্গম পথে।
৮.
রাজধানীর সুবিশাল প্রান্তর যখন জানাজার কাতারে প্লাবিত হলো, তখন তা যেন দিগন্ত ছাড়িয়ে মহাকাশে গিয়ে মিশল। লাখো-লাখো নিগৃহীত মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীর শেষ বিদায়ে শামিল হতে ধাবমান কালকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ইমামের গম্ভীর কণ্ঠে যখন ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিত হলো, তখন চারদিকের জনারণ্য থেমে গিয়ে নেমে এলো এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। জানাজার শেষে দু’হাত আকাশে তুলে যখন ইমাম রুদ্ধকণ্ঠে মোনাজাত শুরু করলেন, তখন লাখো মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠল—হে আরশের মালিক, আজ তোমার সকাশে আমরা এমন এক জননীকে বিদায় দিচ্ছি যিনি সারাজীবন হকের ঝাণ্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। হে আল্লাহ, তুমি তার জীবনের সকল কন্টকাকীর্ণ পথকে জান্নাতের সুশোভিত কানন করে দাও। মোনাজাতের এই শব্দগুলো পিনপতন নিস্তব্ধতা ভেঙে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক অপার্থিব স্পন্দন তৈরি করেছিল।
সেই দোয়ায় অংশ নিয়েছিলেন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সহায়সম্বলহীন সাধারণ মানুষ। তারা সবাই এসেছিলেন তাদের ‘মা’-কে শেষ বিদায় জানাতে। সেই অশ্রুসিক্ত মোনাজাত ছিল এক অপার্থিব সংযোগ, যা রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে আধ্যাত্মিক এক মিলনে পরিণত হয়েছিল।
৯.
একটি দেশের সেনাবাহিনী যখন তাদের প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি ও প্রধানমন্ত্রীকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানায়, তখন সেই কুচকাওয়াজের প্রতিধ্বনিতেও মিশে থাকে শ্রদ্ধা ও শোকের এক গম্ভীর সুষমা। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনটি যখন কবরের কিনারে নেওয়া হলো, তখন সেনাবাহিনীর চৌকস দল তাকে জানাল অন্তিম রাষ্ট্রীয় সম্মান। দাফনের সেই নিদারুণ মুহূর্তে মাটির গহ্বরে যখন প্রিয় নেত্রীকে শুইয়ে দেওয়া হলো, তখন চারপাশের মানুষের চাপা ক্রন্দন এক বিশাল গর্জনে রূপ নিল। তারেক রহমান যখন কম্পিত হাতে মাটি দিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি কেবল তার জননীকে নয়, বরং এই মাটিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশকে পরম মমতায় মাটির কোলে সঁপে দিচ্ছেন। মাটির মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে যে আলোক প্রতিমা তিনি গড়েছেন বাঙালির হৃদয়ে, বিসর্জনের বাজনা তা ম্লান করতে পারে না।
সেই মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে রইল তার দীর্ঘ সংগ্রামের ঘাম ও অশ্রু। দাফন শেষে যখন সবাই একে একে বিদায় নিল, তখন সেই কবরের ওপর পড়া চাঁদের আলো যেন বলছিল—“শান্তিতে ঘুমাও হে অপরাজেয় জননী, এ দেশ তোমায় কভু ভুলিবে না।”
১০.
জননীর বিদায়ে তারেক রহমান আজ কেবল এক শোকাতুর পুত্র নন, বরং এক বিশাল ঐতিহ্যের নিঃসঙ্গ উত্তরাধিকারী। তার কাঁধে এখন সেই ঝাণ্ডা, যা শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী আজীবন ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। জননীর শূন্য কফিন ছুঁয়ে তিনি যে শপথ নিয়েছেন, তা কেবল প্রতিহিংসার নয়, বরং এক বিধ্বস্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দায়বদ্ধতা। এই কঠিন সময়ে তার করণীয় হবে জননীর সেই আপসহীন শৌর্যকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করা। মরমী গদ্যে বললে—শিকড় যখন মাটির গভীর অতলে চলে যায়, তখন বৃক্ষকে ঝড়ের মুখে আরও অটল হতে হয়।
তারেক রহমানের সামনে এখন সেই অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে এক বিচ্ছিন্ন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয় জননীর সেই সাদা গোলাপের মতো স্নিগ্ধ অথচ বজ্রের মতো কঠোর। উত্তরাধিকারের এই রাজপথ কন্টকাকীর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের পদধ্বনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—যিনি পথ দেখান, তাকে একাকীত্বের হিমালয় জয় করতেই হয়। আগামীদিনের বাংলাদেশে তার নেতৃত্ব হবে সেই মশাল, যা অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখাবে।
১১.
দেশনেত্রীর মহাপ্রয়াণে এই জাতির সামনে এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। একটি জাতি তখন বাঁচে, যখন সে তার নায়কদের আদর্শকে ধূলি হতে তুলে নিয়ে ললাটে তিলক হিসেবে পরে। জাতির আজ করণীয় হলো—বেগম জিয়ার সেই অদম্য দেশপ্রেম ও আপসহীন চেতনাকে পাথেয় করে এক নতুন সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা। ব্যক্তিপূজার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের ভোটাধিকার ও আত্মমর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হবে তার প্রতি শ্রেষ্ঠ তর্পণ।
অমানিশার এই ঘোর আধারে জাতিকে শপথ নিতে হবে যে, যে গণতন্ত্রের জন্য দেশনেত্রী তিলে তিলে নিজেকে দহন করেছেন, সেই গণতন্ত্রকে আর কখনো কোনো শৃঙ্খলে বন্দী হতে দেওয়া হবে না। মাটির মমতায় লীন হওয়া সেই মহাপ্রাণ পথ যেন আমাদের এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক শাশ্বত ঐক্যের মিছিলে সামিল হবে। আজকের রিক্ত হৃদয় যেন আগামীদিনের পূর্ণতার ভিত্তি হয়।
১২.
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, এদেশের ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও ধর্মই হবে আমাদের একমাত্র আত্মপরিচয়। তিনি কখনো বিদেশি প্রভুদের কাছে নতিস্বীকার করেননি, বরং প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তার সেই "লুক ইস্ট" পলিসি থেকে শুরু করে সার্ক-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা আজও উদাহরণ হিসেবে টিকে আছে। তিনি ছিলেন সেই আধুনিক রাষ্ট্রের স্থপতি, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা মিলেমিশে একাকার।
তিনি শিখিয়েছেন, ক্ষমতার চেয়েও বড় হলো মানুষের ভালোবাসা। আর তাই তিনি যখন ক্ষমতা থেকে দূরে ছিলেন, তখনও তিনি ছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়ের রানী। তার এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তাই ছিল তার শত্রুদের সবচেয়ে বড় ভীতির কারণ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ভালোবাসার শক্তি সবসময়ই পেশীশক্তির চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রবল।
১৩.
বেগম জিয়ার জীবন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দিনলিপি নয়, এ যেন এক আধুনিক শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডি। একাধারে স্বামী হারানোর দহন, দুই পুত্রকে দীর্ঘ সময় কাছ থেকে দূরে রাখার বেদনা এবং অবশেষে এক সন্তানের বিদেশের মাটিতে অকাল মৃত্যু ও অন্য সন্তানের নির্বাসন—এই সবটুকু মিলিয়ে তিনি যেন এক জীবন্ত শোকগাথা। ইতিহাসের এই বাঁকে তিনি ছিলেন সেই নিঃসঙ্গ শেরপা, যিনি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও একাই আগলে রেখেছেন আদর্শের জীর্ণ পতাকা।
তার জীবনের রিক্ত পাত্র কখনো আদর্শচ্যুত হয়নি। তিনি যেন সেই অবিচল প্রদীপের মতো, যা সহস্র ঝড়ের মুখেও নিজেকে বিলীন হতে দেয়নি। এই ট্র্যাজেডিই তাকে সাধারণ রাজনীতিক থেকে উত্তরণ ঘটিয়েছে এক অমর আইকনে। তিনি কেবল নিজের দুঃখ সয়েছেন তা নয়, তিনি সেই দুঃখকে এক জাতির মুক্তি-সংগ্রামের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
১৪.
হে বন্ধু বিদায়—এই বিদায় কেবল একটি শব্দ নয়, এটি এক পরম শ্রদ্ধার অর্ঘ্য। বেগম খালেদা জিয়া আজ বিদায়ের সেই অলঙ্ঘনীয় সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার স্মৃতিটুকুই আমাদের দুর্গম পথ চলায় একমাত্র পাথেয়। মহাকালের প্রবাহে চড়ে তিনি যখন ইতিহাসের অমরত্বের অভিমুখে যাত্রা করেন, তখন তার সেই রাজপথের পদধ্বনি প্রতিধ্বনি হয় আমাদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক হর্ষধ্বনিতে। বিদায়ের এই করুণ মুহূর্তে প্রিয়তম মাতৃভূমির সেই অমোঘ মাটির ডাক মনে করিয়ে দেয় এক মরমী নিবেদন—
আমার মাটির ঘরে আমার ঠাঁই হোক শেষবেলায় / যেখানে ঘাসের ঘ্রাণ মাখা থাকে মেঘের ছায়ায় / ইতিহাসের দীর্ঘ পথ শেষে আজ থামলো রথ / মাটির মমতায় লীন হলো এক মহাপ্রাণ পথ।
বিদায় বন্ধু, বিদায় দেশনেত্রী। পরিবর্তনের উন্মাতাল স্রোতে তুমি মহাকালের কোলে বিলীন হলেও, তোমার অপরিবর্তন অর্ঘ্য এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় অবিনশ্বর হয়ে মিশে থাকবে। জানাজা থেকে দাফন, রাজপথ থেকে কারান্তরাল—তুমি সর্বত্রই ছিলে এক অপরাজেয় জননী। তোমার সেই সাদা শাড়ি আর স্নিগ্ধ হাসি চিরকাল আমাদের মনে গণতন্ত্রের নববসন্তের জানান দেবে।
হে বন্ধু বিদায়! হে অপরাজেয় ধ্রুবতারা, বিদায়!