ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

মাদুরোর পক্ষে ভেনেজুয়েলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫৮ বার


মাদুরোর পক্ষে ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অপহরণ করেছে, তাকে ‘কাপুরুষোচিত অপহরণ’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় প্রেসিডেন্টের কয়েকজন দেহরক্ষীকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা’ করা হয়েছে; একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার পক্ষের সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকরাও নিহত হয়েছেন।

রোববার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে পাদ্রিনো লোপেজ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ও সমর্থন করেন, যেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে রদ্রিগেজকে খুব চড়া মূল্য দিতে হবে।

দ্য আটলান্টিককে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “সে যদি সঠিক কাজ না করে, তবে তাকে খুব চড়া মূল্য দিতে হবে—সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।”

 

শনিবার ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কারাকাসে হামলা চালিয়ে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা বর্ষণ করে এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে একটি বিমান থেকে মাদুরোকে নামিয়ে ব্রুকলিনের একটি কারাগারে নেওয়া হয়। সোমবার ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে তার প্রথম হাজিরা দেওয়ার কথা।

 

তেল অবরোধকে চাপের হাতিয়ার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন, বিদ্যমান ‘তেল অবরোধ’ কার্যকর করা ছাড়া ভেনেজুয়েলার দৈনন্দিন শাসনে ওয়াশিংটন সরাসরি জড়াবে না; বরং ওই অবরোধকে ব্যবহার করে নীতিগত পরিবর্তনে চাপ দেওয়া হবে।

রুবিওর মন্তব্যগুলো একদিন আগে ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা আমরা চালাব’ ঘোষণার পর তৈরি হওয়া উদ্বেগ কমাতে চাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ তার নিজের রিপাবলিকান জোটের একাংশ, বিশেষ করে বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে; পাশাপাশি ইরাক ও আফগানিস্তানে অতীতের রাষ্ট্রগঠন প্রচেষ্টার স্মৃতি টেনেও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

রুবিও এসব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে থাকা ‘পররাষ্ট্রনীতির প্রতিষ্ঠিত মহল’ ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ভুলভাবে বুঝেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ডোরাল থেকে আল জাজিরার ফিল লাভেল জানান, ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে নির্বাচিত হয়েছেন, যার কেন্দ্রে বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো এবং মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে না ফেলা।

লাভেল বলেন, এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে তিনি (ট্রাম্প) বলেছেন, ‘মাঠে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না’। 

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ, জাতিসংঘের উদ্বেগ
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউনে বৃষ্টির মধ্যে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ‘ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা বন্ধ করো’ ও ‘তেলের জন্য রক্ত নয়’—এমন লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন।

এক বিক্ষোভকারী নিভেন বলেন, ‘আমি সামগ্রিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী।

তারা তেল চায়… করপোরেট ধনকুবেরদের সাহায্য করতে চায়। বোমাবর্ষণ তাদের ক্ষমতা গড়ার উপায়।’

 

শনিবার দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প তথাকথিত ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ কথা খুব কমই উল্লেখ করেন, যা মাসের পর মাস ভেনেজুয়েলার জাহাজ ও স্থাপনায় বোমা হামলার প্রধান যুক্তি ছিল। বরং তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ‘চুরি করেছে’ এবং এখন তা ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের তদন্ত ও অভিশংসনের আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলায় হারানো প্রতিটি জীবনই জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিশংসিত ও তদন্ত করা উচিত।’

সোমবার ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হওয়ার কথা। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানান। তার মুখপাত্র বলেন, এসব হামলা একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।

মাদুরো অপহরণের পর ভেনেজুয়েলায় অনিশ্চয়তা
কারাকাসে কিছু ভেনেজুয়েলান মাদুরোকে ধরে নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও, অন্যরা আশঙ্কা করছেন—এতে দেশে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে।

কারাকাসের মোটরসাইকেল আরোহী রোনাল্ড গৌলে বলেন, ‘সব ভেনেজুয়েলানের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া উচিত। ২৮ বছর ধরে একই সরকার চলছে; এখন এই দেশে রূপান্তরের সময়।’

তবে ব্যবসায়ী হুয়ান কার্লোস রিনকন ছিলেন সতর্ক। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘এর পেছনে অনেক কারসাজি আছে। আমরা শান্তি চাই, এগোতে চাই এবং অন্য যে কোনো দেশের মতো ভেনেজুয়েলার নিজের ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।’

বেকার ফ্র্যাঙ্কলিন হিমেনেজ জানান, তিনি দেশের পক্ষে রাস্তায় নামার সরকারের আহ্বানে সাড়া দেবেন। তিনি বলেন, ‘মাদুরোকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি, এতে বর্তমানের চেয়েও বড় সংঘাত তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘বোমাবর্ষণসহ এসবের বিরুদ্ধে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে, নিজেদের ও মাতৃভূমি রক্ষা করতে হবে।’

অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু ভেনেজুয়েলান দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন। তারা ভেনেজুয়েলা–কলোম্বিয়া সীমান্ত পেরিয়ে কলোম্বিয়ার কুকুতা শহরে যাচ্ছেন। এমনই একজন কারিনা রে বলেন, সীমান্তঘেঁষা সান ক্রিস্তোবাল শহরের পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাপূর্ণ।

তিনি বলেণ, ‘খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইন, মানুষ ভীষণ উদ্বিগ্ন। সুপারমার্কেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে কী হবে আমরা জানি না, তাই খাবার মজুত করতে মানুষ লম্বা লাইনে দাঁড়াচ্ছে।’

কুকুতা থেকে আল জাজিরার আলেসান্দ্রো রামপিয়েত্তি জানান, শুরুতে অনেক ভেনেজুয়েলান মাদুরোর অপসারণে উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কিন্তু দ্রুতই সেই অনুভূতি অনিশ্চয়তায় বদলে যায়।

তিনি বলেন, ‘অনেকে আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো ও এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু বিদ্যমান নেতৃত্বের বড় অংশ বহাল থাকা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী নিয়োগের ফলে সামনে কী হবে, তা নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে।’

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার ওপর।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যায়নি, তবে রাস্তায় সেনা মোতায়েন অস্থিরতা দমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী, সামরিক বাহিনীর অংশ ও দেশে সক্রিয় কলোম্বীয় বিদ্রোহী নেটওয়ার্কসহ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, এই ঝুঁকি রয়ে গেছে।’


   আরও সংবাদ