ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:২৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪১ বার
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন ছিল বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতে যে কখনো টানাপোড়েন ছিল না, তা কিন্তু নয়। কোনো কোনো সরকারের আমলে টানাপোড়েন ছিল। তবে গত ১৫ বছরে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আবার ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে এমন তিক্ততা স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম। প্রায় চার মাস ধরে প্রায় প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লোকজনকে ঠেলে পাঠানো (পুশইন) হচ্ছে, যা নজিরবিহীন। বাংলাদেশ পরিবর্তিত পরিস্থিতি আর সময়ের নিরিখে এবং জন-আকাক্সক্ষার প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর স্বার্থের ভিত্তিতে ‘একটি ইতিবাচক সম্পর্ক’ রাখার কথা বলে এসেছে বারবার। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনা করেন।
তৌহিদ হোসেন ওই আলোচনায় কর্মকর্তা পর্যায়ে বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তোলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ডিসেম্বরে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর এ বছরের এপ্রিলে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়েছে।
তার পরও সম্পর্কের দূরত্ব ঘোচেনি। ভারত স্পষ্ট বলে দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ‘এই সম্পর্ক স্বাভাবিক’ হবে না।
তবে এই সম্পর্কের অবনতি চূড়ান্ত আকার ধারণ করে যখন আইপিএলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিলামে নেওয়ার পরও বাদ দেওয়া হয়।
কূটনীতিবছরজুড়ে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত থাকে। ভারতীয় গণমাধ্যমে একতরফাভাবে, তথ্য যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা ভারতের সমালোচনা করতে গিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে বিদায়ি বছরের ডিসেম্বরে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির খুনি পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এরপর বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ওসমান হাদির খুনিদের ভারতে আশ্রয় দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে। বাংলাদেশে ‘জুলাই ঐক্য’ নামে একটি সংগঠনের ডাকে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ নামে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল দূতাবাসের সামনে গিয়ে ‘প্রতিবাদ সমাবেশ’ করা। যদিও বাংলাদেশের পুলিশ ঢাকার উত্তর বাড্ডাতে ব্যারিকেড দিয়ে মাঝপথেই বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয়।
তা ছাড়া বিজয় দিবসে (১৬ ডিসেম্বর) বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকার ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম প্রায় ১৫ বছর আগে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুনের স্মরণে ‘ফেলানী এভিনিউ’ রাখার কথা ঘোষণা করে।
দেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সেই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সীমান্ত হত্যা বন্ধ চায়। আমাদের বোন ফেলানী কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় জীবন দিয়েছিল। ভারতের এই নৃশংসতা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা এই সড়কের নাম করেছি ফেলানী সড়ক।’
এর কদিন আগেই ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি চালানো বন্দুকধারীরা ভারতে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের এক অভিযোগের ভিত্তিতে এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেছিলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের শত্রুদের তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশও ভারতবিরোধী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দিয়ে ‘সেভেন সিস্টার্স’কে (ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল) ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইবে।
উত্তর-পূর্ব ভারত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দিল্লির চোখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি ইস্যু- সেই আঙ্গিকে হাসনাত আবদুল্লাহর এই মন্তব্যকে ভারত খুবই ‘প্ররোচনামূলক’ বলে মনে করেছে। বিশেষ করে ভারত যেহেতু মনে করে, অতীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় পেয়েছে এবং সে দেশের বিগত কিছু কিছু সরকার তাদের প্রশ্রয়ও দিয়েছে- তাই হাসনাত আবদুল্লাহর এই মন্তব্যকে হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেই দিল্লিতে কর্মকর্তাদের অভিমত।
এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন করে অবনতি ঘটে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের রাষ্ট্রদূতকে সেগুনবাগিচায় তলব করে। এর জবাবে ভারতও সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাংলাদেশের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করলে বাংলাদেশ সরকার ভারতে ভিসা সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরকম পরিস্থিতিতে বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর কয়েক ঘণ্টার ঝটিকা সফরে ঢাকায় আসেন। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতের শোকবার্তা পৌঁছে দেন। কিন্তু তিনি অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কিংবা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এক মাধ্যমে ভারত বুঝিয়ে দেয় যে, তারা বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে চায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাওয়া হয়। কিন্তু ভারত সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। এ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অস্বস্তি বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এক ধরনের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। যদিও গত ১৬ মাসে উভয় পক্ষ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলেছে কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান। এ ছাড়া, সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি এবং ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া, চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সম্পর্ক খুব বেশি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত হয়তো তাদের সঙ্গে নতুন করে পথচলার কৌশল নির্ধারণ করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে চলছে- সেটি সবাই দেখতে পাচ্ছে। সম্পর্ক সবসময় একরকম যায়ও না। তবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কারও জন্যই সুখকর নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারতের দিক থেকে আরও বেশি আন্তরিকতা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন। সময় খুব কম। নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমূল পরিবর্তনের সুযোগ কম। তবে, রুটিন কাজগুলো সচল রাখা প্রয়োজন।