ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারী, ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার
সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিদের কারণে ভালো নেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবী চিত্রল হরিণ। এই দুই বন্যপ্রাণী এখন চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। শীত মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন খালের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বন থেকে লোকালয়ে চলে আসে হরিণের পাল। আবার খালে পানি কম থাকায় বন সংলগ্ন এলাকার মানুষ বনে ঢুকে হরিণ শিকারের ফাঁদ পাতে।
৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির অন্তর্ভুক্ত বনাঞ্চলে হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়া একটি স্ত্রী বাঘ উদ্ধার করে বন বিভাগ। ‘ট্রানকুইলাইজার গান’ দিয়ে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করে বাঘটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারের পর বিকেল ৩টার দিকে লোহার খাঁচায় করে বাঘটিকে বন থেকে বের করা হয়। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাঘটিকে খুলনায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে আনা হয়েছে।
বাঘটি এখনও খুলনায় চিকিৎসাধীন।
সুন্দরবনের শরকির খালের অদূরে বাঘ আটকে পড়া এলাকা থেকে আরও ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি দিনব্যাপী শরকির খাল থেকে জয়মনি ঠোঁটা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে তল্লাশি করে অন্তত আটটি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করেন বন বিভাগের সদস্যরা।

সুন্দরবনের মধ্য থেকে বয়ে চলা খাল।
বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষায় অধিকতর সতর্ক থাকার অংশ হিসেবে বন বিভাগ এই তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে বাঘ আটকে পড়া সুন্দরবনের ওই এলাকা থেকে দুটি এবং নজরুলের ছিলা এলাকা থেকে ছয়টি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার হয়।
অনুসন্ধানীতে জানা গেছে, এর আগেও হরিণ শিকারিদের ফাঁদে পড়ে বাঘের পা বা হাত হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১৪ সালের।
সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারিরা এখনও বেপরোয়া।
চোরা শিকারিদের পাশাপাশি এখন বনদস্যুরাও বাঘ এবং হরিণ মেরে এসবের হাড়, মাংস, চামড়া, পুরুষাঙ্গ ও দাঁত বিদেশে পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হরিণ শিকার নিত্য দিনের ঘটনা
হরিণ শিকারের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। তারা বনের মধ্যে ফাঁদ পেতে ও গুলি করে চিত্রা ও মায়া হরিণ শিকার করছে। পরবর্তীতে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মাংস, মাথা, শিং বিক্রি করে। এভাবে হরিণ শিকার করে বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে ধরাও পড়েন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। গত একযুগে এক লাখ চার হাজার ফুট মালা ফাঁদ, অবৈধ ও লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র, স্পিডবোডসহ অসংখ্য নৌ-যান উদ্ধার করা হয়েছে সুন্দরবন থেকে।
সর্বশেষ বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়া একটি হরিণ জীবিত উদ্ধার করেন বনরক্ষীরা। এ সময় আব্দুল হাকিম (৪০) নামের এক শিকারিকে আটক করা হয়।
শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যকেন্দ্রের ডিমের চর থেকে হরিণটি উদ্ধার ও শিকারিকে আটক করা হয়। পরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয় হরিণটিকে।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর (বুধবার) ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ ও একটি বন্যশূকর উদ্ধার করেছেন স্থানীয়রা। ২৫ ডিসেম্বর একই এলাকার লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছিল।
২৬ নভেম্বর ভোরে বাগেরহাটের মোংলা থেকে ৩২ কেজি হরিণের মাংস, দুটি মাথা, আটটি পা ও দুই হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদসহ এক হরিণ আক্তার বিশ্বাস (৪০) নামের এক শিকারিকে আটক করা হয়। উপজেলার কানাইনগর এলাকায় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে এই শিকারিকে আটক করে।
অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বৈধ বা অবৈধভাবে বনে ঢুকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরিণ শিকার করেন শিকারিরা। বন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পেশাদার হরিণ শিকারিদের আছে বিশেষ সিন্ডিকেট এবং তাদের সঙ্গে থাকে এজেন্ট ব্যবসায়ীরা। এসব এজেন্টের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়। কোস্টগার্ডসহ বন বিভাগের অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু মাংস ধরা পড়লেও অধিকাংশ শিকারি থেকে যাচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তাদের কারণে সুন্দরবনে হরিণ শিকার কমছে না।
সুন্দরবনের বাঘ-হরিণের সংখ্যা
২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি পাওয়া গেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। এই জরিপে প্রতি ১শ বর্গ কিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ২ দশমিক ৬৪ পাওয়া গেছে।

সুন্দরবনের মধ্য থেকে বয়ে চলা খাল।
জরিপটি ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত হয়, যেখানে ৬০৫টি গ্রিডে এক হাজার ২১০টি ক্যামেরা বসিয়ে ৩১৮ দিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঘের ছবি এবং ১০ সেকেন্ডের ভিডিওধারণ করেছে, যা থেকে প্রায় ১০ লক্ষাধিক ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে সাত হাজার ২৯৭টি বাঘের ছবি পাওয়া গেছে। বাঘ সংরক্ষণে নানা উদ্যোগের মধ্যে গত আড়াই দশকে ২১টি বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পাচারকারীদের হাতে মারা পড়েছে ২৬টি।
বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত আড়াই দশকে সব মিলিয়ে মারা যাওয়া বাঘের সংখ্যা ৬২। ২০২৪ সালে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২৫, যা আগের জরিপের চেয়ে ১১টি বেশি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপের তথ্য মতে, বর্তমানে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে।
এর আগে ২০০৪ সালে হরিণের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজারটি। সেই হিসাবে ১৯ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে হরিণ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৬০৪টি।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, সুন্দরবনে হরিণ শিকারিদের ফাঁদে আটকে পড়া বাঘটি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে।
চোরা শিকারিদের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগ এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ফাঁদ পাতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে সুন্দরবনে অবৈধ ফাঁদ পাতা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে। হরিণের চোরা শিকার বন্ধ, সুন্দরবনের বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ, বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।