ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ঢাকায় অসহায় ভাড়াটিয়ারা

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৬:৪১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


ঢাকায় অসহায় ভাড়াটিয়ারা

বেসরকারি চাকরিজীবী আলাল উদ্দিন ঢাকার ভাটারা এলাকায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নবনির্মিত বাসায় ওঠেন সপরিবারে। বাড়িমালিকের সঙ্গে তখন মাসিক ভাড়া নির্ধারিত হয় ২৫ হাজার টাকা। আলাল উদ্দিন মাস শেষে সেই ভাড়াই দিয়ে আসছিলেন। বছর শেষে এলো ডিসেম্বর।

আলাল উদ্দিন আশা করছিলেন, নতুন এই বাড়িতে ভাড়া এই বছর অন্তত বাড়বে না। 

 

কিন্তু মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাড়িওয়ালা হুট করে আলালকে ডেকে বলেন, আপনি যে বাসায় থাকেন এমন বাসায় এখন ৮-১০ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়ায় ভাড়াটিয়ারা উঠতে চাইছে। আপনাকেও ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে। আলাল উদ্দিন নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

ভাড়া বাড়ানোর কথা বলতে পারেন মালিক, তাই বলে এতটা বলবেন?

 

আরেক চাকরিজীবী কামরান হোসেন ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাচেলর থাকতেন ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে। ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া ছিল ১৩ হাজার টাকা। তিনি তার পরিবারকে নিয়ে ওই বছরের মে মাসে কম ভাড়ার দুই রুমের একটি বাসায় ওঠেন। সেসময় ভাড়া নির্ধারিত হয় ১১ হাজার টাকা।

কিন্তু কামরানের বাড়ির মালিক তাকে অবাক করে মাত্র আট মাসের মাথায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তার বাসার ভাড়া বাড়িয়ে দেন এক হাজার টাকা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাড়িয়ে দেন আরও দেড় হাজার টাকা। পরের বছর ২০২৫ সালে আরও এক হাজার টাকা বাড়ানোর পর নতুন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও তাকে এক হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের কম সময়ের মধ্যে তাকে সাড়ে চার হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। অথচ কামরান খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, তার আগের ব্যাচেলর ফ্ল্যাটের ভাড়া এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে মোট দেড় হাজার টাকা।

 

শুধু আলাল উদ্দিন বা কামরানের ক্ষেত্রেই নয়, ঢাকায় ভাড়া থাকা বেশিরভাগ বাসিন্দাকেই এমন আকস্মিক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। বছর শেষ হলে কোনো আইন বা নিয়ম-কানুনের বালাই ছাড়াই বাড়ির মালিক বাসার ভাড়া বাড়িয়ে দেন। যেন তার ইচ্ছাই আইন, তার খেয়ালখুশিতেই নির্ধারিত হয় বাসাভাড়া। নেই কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নেই আইনি প্রতিকার।

এভাবে প্রতিবছর বাসাভাড়া বাড়তে থাকার কারণে রাজধানীর বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া খাবার-দাবারসহ অন্য অনেক খরচ ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো কোনো বয়স্ক মানুষ তার ওষুধপত্র সেবনও কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুদের খাবার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে পুষ্টিকর খাবারও।

এতেও কুলিয়ে না উঠতে না পারায় রাজধানীর মধ্য ও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী অনেককে বাসা ছেড়ে আরও কম ভাড়ার বাসায় চলে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ একেবারে অসহায় হয়ে পরিবারকেই গ্রামে পাঠিয়ে নিজে ব্যাচেলর জীবন বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে করোনা মহামারি ও পরবর্তীতে শিল্পকারখানা, ব্যবসাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ ছোট হয়ে বা বন্ধ হওয়ার পর এমন চিত্র বেশি দেখা যাচ্ছে।

রাজধানী মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকাভেদে নতুন বছরের জানুয়ারি মাসে ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এই ভাড়ার বাইরে ভাড়াটিয়াকে ভিন্ন করে গুনতে হয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও সার্ভিস চার্জ। এর ফলে বাড়িভাড়া বাড়লে সঙ্গে সরকারের বৃদ্ধি সাপেক্ষে অন্যান্য সেবার বাড়তি খরচ যোগ হচ্ছে। এতে বছর শুরু হওয়া মানে ঢাকার কর্মজীবী মানুষের ঘাড়ে চাপে বাড়তি খরচ। খরচ কমিয়ে সামাল দিতে না পেরে তুলনামূলক কম ভাড়ার বাসায় চলে যাচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা।

মিরপুরের পূর্ব কাজীপাড়ার ১৮২ নম্বর বাড়ির ভাড়াটিয়া শাহজাহান ব্যাপারীকে জানুয়ারি থেকে বাড়তি দুই হাজার টাকা দিতে বলেছেন বাড়ির মালিক। ডিসেম্বর পর্যন্ত তার বাসার ভাড়া ছিল ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। জানুয়ারি মাস থেকে দুই হাজার বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ করা হয়েছে। কেন এত ভাড়া বাড়ানো হলো, জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা তাকে বলে দিয়েছেন, ‘দুই হাজার বেশি দিতে হবে, বাড়তি ভাড়া না দিলে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে’। উপায়ান্তর না দেখে কম ভাড়ার অন্য বাসা খুঁজে বের করেছেন শাহজাহান।

হতাশাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাড়তি ভাড়া দিয়ে পরিবারের অন্যান্য খরচ সামাল দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। এ জন্য তুলনামূলক কম ভাড়ার বাসায় চলে যাচ্ছি। বাসা ভাড়ার একমাত্র নিয়ন্ত্রক বাড়িওয়ালা। বাড়ির মালিক যা বলবে তাই-ই একমাত্র বিধান। বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছি।

বাসার ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সমস্যায় পড়েছেন মিরপুরের ১০ নম্বর সেকশনের সেনপাড়া পর্বতার স্বপ্ন গলির গিয়াস উদ্দিন। তার দুই রুমের বাসায় ডিসেম্বর পর্যন্ত ভাড়া ছিল ৯ হাজার ২০০ টাকা, সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুতের বিল আলাদা দিতে হতো। ৩১ ডিসেম্বর তাকে জানানো হয়, জানুয়ারি থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এতে নতুন বছরে ৯ শতাংশ ভাড়া বেড়ে যায়। গত বছর বেড়েছে, এবারও কেন এত বাড়বে? এমন প্রশ্নের জবাবে বাড়িওয়ালা বলেছেন—ভাড়া বাড়বে, পারলে থাকো, না থাকলে চলে যাও।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, হঠাৎ করে চলে যাওয়া যায় না, নতুন বাসা দেখার দরকার আছে, ছেলেরা কেউ চাকরি এবং কেউ লেখাপড়া করে—তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখে তারপর যেতে হবে। এ জন্য একটা মাস দরকার, তাই আছি। ছেলেরা বাসা খোঁজা শুরু করেছে।

মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের এক নম্বর বিল্ডিং এলাকার ছোট্ট ব্যবসায়ী আক্তার হোসেনের বাড়তি আয় নেই, যে রোজগার হয় তাও মাঝে মাঝে কমে যায়। দুই মাস মোটামুটি চললেও আরেক মাসে চলতে কষ্ট হয়। এর মধ্যে বাসাভাড়া বাড়ানো হয়েছে। নতুন ভাড়ায় আক্তারের চলা কঠিন হবে। কিন্তু বাসা তার ক্ষুদ্র ব্যবসার স্থানের কাছে থাকার কারণে এখন অন্যত্রও যেতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে।

আক্তার হোসেনের ৫০৭/২ নম্বর বাড়িটি সাদ্দাম হোসেন নামে এক ব্যক্তির। ডিসেম্বর পর্যন্ত আক্তারকে ভাড়া দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার্ভিস চার্জসহ চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া বাড়িয়ে ১১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার্ভিস চার্জ। এ ভাড়া দিয়ে কোনোভাবেই চলা সম্ভব নয় বলে জানান আক্তার হোসেন।

‘বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে’
ঢাকায় ভাড়াটিয়ার স্বার্থ রক্ষার কোনো আইন বা কর্তৃপক্ষ নেই। বাড়ি মালিকের ইচ্ছাই শেষ কথা। তারা যখন ইচ্ছা তখন বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করছে। এই অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য কোথাও দ্বারস্থ হওয়ার মতো কোনো কর্তৃপক্ষও নেই। ফলে বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ে আইনের প্রয়োগ নেই, কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। যে আইনটা আছে এটা মৃত আইন। এর কোনো বাস্তবায়ন নেই। এই সুযোগটা নিয়ে বাড়িমালিকরা যে যার ইচ্ছা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করছে। হঠাৎ করে বলে দিল—এই মাসে বাড়ল, বেশি টাকা ভাড়া দাও। এটা মানতে হয়।

তিনি বলেন, বাড়িভাড়া বাড়বে, এটা কত বাড়বে তার একটি হার ও ন্যায্যতা থাকতে হবে। সেটা নেই। যেহেতু কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা নেই এটা দেখার জন্য; কোন এলাকায় কত ভাড়া হতে পারে—ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং কোনো সমস্যা হলে সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় অফিসগুলো এর সালিশ-মীমাংসা করবে, আদালতের এমন একটি নির্দেশনা আছে। আমরা এটাকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা চেয়েছি কেউ না কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাক, একটি কর্তৃপক্ষ হোক। তাহলে ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের মধ্যে যে সমস্যা হচ্ছে তার একটা সমাধানের জায়গা হতো। 

তিনি বলেন, বাসাভাড়া নিয়ে কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না, বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো বাড়াচ্ছে। ভাড়াটিয়া অসহায়। কারণ তারা পুলিশের কাছে যেতে পারছে না, সিটি করপোরেশনের কাছে যেতে পারছে না। সহকারী জজ আদালতে শুধু রেন্ট কন্ট্রোলার নামে একটি সিস্টেম আছে। ওখানেও কার্যত কোনো সমাধানের পথ নেই; বাড়ির মালিককে কিছু বলতে পারে না। এই যে অস্বস্তিকর অবস্থা—এর অবসান হওয়া উচিত।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক বাড়ির মালিক ও ভাড়াটে রয়েছে। বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়া রাখা, ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় বা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বললেও এ বিষয়ে ভাড়াটিয়ার স্বার্থ রক্ষার কোনো আইন নেই। নেই উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে বাড়িভাড়ার বিষয়টি দেখার জন্য একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পদ কর্মকর্তার নেতৃত্বে দুটি আলোচনা সভা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

ডিএনসিসির এ সম্পর্কিত আঞ্চলিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান (উপসচিব)-এর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি ভাড়াটিয়া স্বার্থ সংশ্লিষ্ট খসড়া নীতিমালা প্রস্তুতে ডিএনসিসির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। জিয়াউর রহমান বলেন, বাড়ির মালিক কী কী করতে পারবে, কী কী পারবে না—বৈঠকে সে সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, ফাইনাল নয়। এর ভিত্তিতে এখনই কিছু করার মতো কিছু হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতেই এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।


   আরও সংবাদ