ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

গ্রিনল্যান্ডকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৬:২৭ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৯ বার


গ্রিনল্যান্ডকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছেন

ডেনমার্কের অনুরোধে গ্রিনল্যান্ডে জার্মানি ও সুইডেনের সৈন্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত স্বশাসিত এই অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছানোর কথা রয়েছে জার্মান সেনাদের। আবার অনেকের মতে, ইউরোপ যেন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেই নেয়, এটাই মূলত চাইছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এর আগে সোমবার (১৪ জানুয়ারি) ওয়াশিংটনে ডেনমার্ক-যুক্তরাষ্ট্র উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বরং বৈঠকের পর ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত। তার ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে না এলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।

 

এই বক্তব্যের পর হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরও এক ধাপ এগিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি (এআই) একটি ছবি পোস্ট করে। সেখানে গ্রিনল্যান্ডবাসীর সামনে প্রতীকীভাবে একটি প্রশ্ন তোলা হয় ওয়াশিংটন না মস্কো-বেইজিং? এই পোস্ট ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

 

 

অন্যদিকে বৈঠক শেষে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেছেন, আমরা যে একমত হতে পারিনি, অন্তত সেটাতেই আমরা একমত হয়েছি।

ওই বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোটজফেল্টও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত হিসেবে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু করবে। তবে এর মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে জার্মানি ও সুইডেনের সেনা পাঠানোর ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।

 

এ প্রসঙ্গে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন বলেন, উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। শীতল যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ‘শান্তির লভ্যাংশে’ ভর করে চলেছে। কিন্তু এখন আর সেই বাস্তবতা নেই। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ন্যাটোর সদস্য হিসেবে একসময় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক স্থাপনা ও প্রায় ১০ হাজার সেনা ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি ঘাঁটি ও প্রায় ২০০ মার্কিন সেনা রয়েছে।

তাঁর মতে, বর্তমান বাস্তবতায় পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

 

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর মাধ্যমে কি ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন সামরিক ব্যয় কমানোর নতুন কৌশল নিচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় একটি কারণ ন্যাটোর আর্থিক ভারসাম্য।

গত পাঁচ বছরে ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, যার বড় অংশই বহন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯–২০২০ সালে ন্যাটোর মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে কোভিড-পরবর্তী পুনর্গঠনের কারণে এই ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২–২০২৪ সময়কালে প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৪ সালে তা ছাড়িয়ে যায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই বহন করে প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয়।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা নিজেদের মোট জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ড তার মতো করেই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ এখনো সেই ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি, যা নিয়ে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট। মূলত ন্যাটোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বোঝা কমাতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপ কৌশলের অংশ। ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে চাইছে—ইউরোপ নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেই নিক এবং ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বোঝা কমুক। গ্রিনল্যান্ডকে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি বার্তা দিচ্ছে—নিজেদের নিরাপত্তায় বেশি অর্থ ব্যয় না করলে কৌশলগত সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটন এককভাবেই এগোবে।

সমাধান নেই, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
এই উত্তেজনার মধ্যেই ডেনমার্কের আমন্ত্রণে জার্মানি ১৩ প্লাটুন সেনা গ্রিনল্যান্ডে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা একটি আন্তর্জাতিক দলের অংশ হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে সুইডেন গ্রিনল্যান্ডে সামরিক কর্মকর্তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং নরওয়ে পাঠাচ্ছে দুইজন সামরিক প্রতিনিধি।

ইউরোপীয় দেশগুলোর এই তৎপরতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে গ্রিনল্যান্ড এখন আর কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। তবে বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতি ইতোমধ্যে নতুন এক অনিশ্চিত যুগে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে ইউরোপও ঢুকে পড়ছে এক নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতায়, যেখানে গ্রিনল্যান্ড হয়ে উঠছে বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতীক।


   আরও সংবাদ