আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার
ইরানে গত মাসের বিক্ষোভে হাজারো মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দেশটিতে বিক্ষোভের ঘটনায় হাজারো মানুষ সরকারি প্রতিঘাতে নিহত হয়েছে। কিন্তু তারা সেটি প্রকাশ করছে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এমন পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের কাছেই প্রমাণ চেয়েছে তেহরান।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আঘারচি বলেন, সরকার ৩ হাজার ১১৭ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যাদের তিনি ‘সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী অভিযানের শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তালিকায় প্রায় ২০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে আরাঘচি লেখেন, আমাদের তথ্যের যথার্থতা নিয়ে কেউ সন্দেহ করলে প্রমাণ দিন।
এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, তালিকাভুক্তদের মধ্যে ৬৯০ জন সন্ত্রাসী, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তায় সশস্ত্র ছিল।
আরাঘচির এ বক্তব্য আসে কয়েক ঘণ্টা পর, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, বিক্ষোভে ৩২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইরানের জনগণ ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অধীনে নরকসম জীবন কাটাচ্ছে। একই সময়ে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ন্যায্য চুক্তির পক্ষে বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমেও কথা বলছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাতো বলেন, বিক্ষোভের ঘটনায় ২০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে।
তবে রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও ছয় সপ্তাহব্যাপী যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনএ জানিয়েছে, তারা ৭ হাজারের বেশি নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করেছে এবং আরও প্রায় ১২ হাজার ঘটনার তদন্ত চলছে।
গত শুক্রবার ৩০ জন বিশেষ প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের যৌথ বিবৃতিতে ইরান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়— বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার, গুম বা নিখোঁজ হওয়া হাজারো মানুষের অবস্থান ও পরিণতি প্রকাশ করতে এবং সংশ্লিষ্ট সব মৃত্যুদণ্ড ও ফাঁসি কার্যকর স্থগিত রাখতে।
তারা বলেন, সরকারি পরিসংখ্যান ও তৃণমূল পর্যায়ের হিসাবের বিশাল ব্যবধান পরিবারগুলোর যন্ত্রণাকে আরও গভীর করছে এবং মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আটক বা নিহতদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে শিশু, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য, এমনকি আফগান নাগরিকও রয়েছেন।
আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, বিক্ষোভকারীদের আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মীরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত কিছু স্বীকারোক্তিকে জোরপূর্বক আদায় করা বলে সমালোচনা করা হয়েছে।
শনিবার ইরানের বিচার বিভাগের সরকারি সংবাদ সংস্থা মিজান সংবাদ সংস্থা একটি আদালত কক্ষের ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে তিন ব্যক্তি তেহরানে অস্থিরতার সময় মোটরসাইকেল, একটি মসজিদ ও কোরআনের কপি পোড়ানোর ঘটনায় অনুতাপ প্রকাশ করেন বলে দেখানো হয়।
বিক্ষোভের পর কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর শনিবার তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের শিক্ষার্থীরা আবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফেরেন। রাজধানীর প্রভাবশালী শফির বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি আলাদা সমাবেশকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট বাসিজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অন্য শিক্ষার্থীরা লজ্জাহীন স্লোগান দিচ্ছেন, পাল্টা জবাবও আসে।
স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলগুলোয় কড়া নিরাপত্তা জারি রয়েছে। রাজধানীর আশপাশের কয়েকটি শহরে অন্তত ২৩০ শিশু-কিশোর নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এবং শ্রেণিকক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শিক্ষকরা গত সপ্তাহে ধর্মঘট পালন করেন।
এদিকে সরকার গত মঙ্গলবার ও বুধবার তেহরানে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি আমিরি শনিবার জানান, মার্চের শেষদিকে শুরু হওয়া পারস্য নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হবে ঐক্য ও সহমর্মিতা, যার লক্ষ্য হাজারো প্রাণহানির শোক কাটিয়ে ওঠা।
তবে এর বিপরীতে বহু পরিবার নিজ উদ্যোগে প্রতিবাদী স্মরণানুষ্ঠান পালন করছে। প্রিয়জন নিহত হওয়ার ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে নিহতদের ছবি তুলে ধরা, করতালি, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও প্রতীকী নৃত্যের মাধ্যমে শোক ও প্রতিরোধ একসঙ্গে প্রকাশ করতে দেখা গেছে।