ঢাকা, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বোমাবর্ষণের মধ্যে যেভাবে দিন কাটছে ইরানিদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ৫ মার্চ, ২০২৬ ১৯:৩৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৫ বার


বোমাবর্ষণের মধ্যে যেভাবে দিন কাটছে ইরানিদের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের মধ্যে কোনোভাবে স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। একই সময় দেশজুড়ে বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগও কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কিছু পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

তারা জনগণকে পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

 

পূর্ব তেহরানের বাসিন্দা সেপেহর আল জাজিরাকে বলেন, “যুদ্ধ হয়তো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। তাই পরিস্থিতি খুব খারাপ না হলে আমি ও আমার পরিবার শহর ছাড়ব না। আপাতত জীবন চলছেই।

 

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে তার এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। কখনো ঘন ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কখনো বিস্ফোরণের কম্পনে জানালাও কেঁপে উঠছে।

প্রায় এক কোটি মানুষের শহর তেহরানের বিভিন্ন এলাকায়ও প্রায় একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার সকালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দিন-রাত যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে।

এই হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
Iran
বৃহস্পতিবার ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় আকারে বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

 

রাজধানীর রাস্তাঘাট স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ফাঁকা এবং যানজটও কম। অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।

তবে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এখনও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যাচ্ছে, সরাসরি দোকান থেকে বা অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে।

 

পশ্চিম তেহরানের বাসিন্দা মারজান বলেন, “কিছু সময়ের জন্য বোমাবর্ষণ থেমে গেলে আমি দিনে একবার কাছের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনি। সাধারণত রুটির দোকানে লাইন থাকে, তবে খুব বড় নয়। কিছু পেট্রোল পাম্পেও লাইন দেখা যায়।”

তিনি বলেন, “কয়েকটি পণ্যের ঘাটতি থাকতে পারে, তবে আপাতত দোকানে বেশির ভাগ জিনিসই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে কে জানে। যাই হোক, জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।”

যুদ্ধ শুরুর দুই দিন আগে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদা দুটি প্রতিবেদনে দেখায়, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রায় ৯ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানায়, ইরানি ক্যালেন্ডারের বাহমান মাসে (যা ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে) বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সময়ের মূল্যস্ফীতি ৬২ দশমিক ২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের সময়ের পর এত উচ্চ মূল্যস্ফীতি খুব কমই দেখা গেছে। এতে সম্ভাব্য অতি-মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির দিক থেকেও ইরান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে। গত মাসের শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০৫ শতাংশ।
Iran
এর মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ২০৭ শতাংশ, মাংস ১১৭ শতাংশ, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্য ১০৮ শতাংশ, ফল ১১৩ শতাংশ এবং রুটি ও ভুট্টার দাম বেড়েছে ১৪২ শতাংশ।

ইরানের ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানানন, পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে সরকারের কিছু উদ্বেগ ছিল, তবে সৌভাগ্যবশত এখন পরিস্থিতি ভালো।

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ওষুধের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। অনেক ওষুধের দাম বেড়েছে এবং কিছু ওষুধের (যেমন: বিষণ্নতা প্রতিরোধী ওষুধ) তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সংকটে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে শুধু দেশীয় তৈরি ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, বিদেশি ওষুধ প্রায় অনুপস্থিত।

সরকার এখনও মানুষের জন্য ন্যূনতম নগদ ভর্তুকি দিচ্ছে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে। সম্প্রতি এই ভর্তুকি কর্মসূচিতে কেনা যায় এমন পণ্যের তালিকায় শিশুদের ডায়াপারও যোগ করা হয়েছে, যার দাম গত কয়েক মাসে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ চালু রাখা যায়, সে জন্য প্রাদেশিক গভর্নর ও মন্ত্রীদের কম আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বড় পরিমাণে জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

দশকের পর দশক দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতবিক্ষত ইরানি অর্থনীতি আবারও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সময়ে দেশটির বাহিনী অঞ্চলজুড়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানি রিয়ালের দর ছিল প্রতি মার্কিন ডলারে প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল, যা প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা গেছে, তবে স্বর্ণের মতো সম্পদের দাম বেড়েছে।

‘অরওয়েলীয়’ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
বোমাবর্ষণ চলার মধ্যেই টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে রেখেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। এর ফলে মানুষ মূলত রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি বার্তা সেবার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।

এসব মাধ্যমে মূলত সরকারি বিবৃতি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিভিন্ন সফল হামলার খবর প্রচার করা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক এলাকায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেসব খবরই বেশি প্রচার করা হচ্ছে। বিপরীতে বহু পুলিশ স্টেশন বা আধাসামরিক ঘাঁটিতে হামলার প্রভাব নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই।

সাংবাদিক মিলাদ আলাভি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “৫৯টির বেশি ভিপিএন ও প্রক্সি কনফিগারেশন চেষ্টা করে ছয় ঘণ্টা পর এই টুইটটি পাঠাতে পারলাম।”

তিনি আরও বলেন, “ইরানে স্থায়ী ও মোবাইল দুই ধরনের ইন্টারনেটই বিচ্ছিন্ন। আমরা কোনো খবর পাচ্ছি না, অথচ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে ইরান যেন তেল আবিব ও ওয়াশিংটন দখলের দ্বারপ্রান্তে!”

গত শনিবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যুদ্ধবিমান বোমা হামলা চালানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ তীব্রভাবে কমে যায়। ওই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগ আগের তুলনায় ১ শতাংশেরও কমে নেমে আসে এবং এখনও সেই অবস্থায় রয়েছে, এমন তথ্য দিয়েছে ক্লাউডফ্লেয়ার ও নেটব্লকসের মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো।

নেটব্লকস বৃহস্পতিবার জানায়, “ক্রমশ অরওয়েলীয় এক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে”, কারণ যারা বৈশ্বিক ইন্টারনেটে সংযোগের চেষ্টা করছে, টেলিকম কোম্পানিগুলো তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ভিপিএন ব্যবহারের চেষ্টা বা তা শেয়ার করার পর তারা টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালু থাকায় স্থানীয় ওয়েবসাইট ও সেবাগুলো সীমিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে কয়েকটি বড় সংবাদ ওয়েবসাইটের মন্তব্য বিভাগই এখন অনেক ইরানির জন্য অনলাইনে মতপ্রকাশের একমাত্র জায়গা হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সেখানে সরকারের সমালোচনা বাড়তে থাকায় বিচার বিভাগ প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট জুমিট–এর মন্তব্য বিভাগ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাগরিকদের বারবার আহ্বান জানাচ্ছে, কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দেখলে যেন তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে জানায়।

গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় ২০ দিনের ইন্টারনেট বন্ধের মতোই এবারও বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগের জন্য কালোবাজার তৈরি হয়েছে।

আল জাজিরা এমন দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে, যারা জানিয়েছেন তারা ইরানের ভেতরে বিক্রেতাদের কাছ থেকে কয়েক গিগাবাইট সীমাবদ্ধ প্রক্সি সংযোগ কিনতে পেরেছেন। এসব সংযোগ খুব ধীরগতির এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিরাপত্তার কারণে তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি।

এদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কথা বলছেন। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনও ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা কবে তুলে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা ঘোষণা করেনি।

আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে অনূদিত


   আরও সংবাদ