ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৬ মার্চ, ২০২৬ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩১ বার
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে ভয়াবহ চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এসব বাস্তবতার মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ফেব্রুয়ারি মাসের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চালের দামের চাপ কিছুটা কমলেও মাছ, সবজি ও ফলের দাম বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। একই সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.২৯ শতাংশ। যদিও চালের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেনি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে চালের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চালের মূল্যস্ফীতিও কমে ১১.৯২ শতাংশ থেকে ৭.৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে একই সময় মাছ, ফল ও সবজির দাম বাড়ায় সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বজায় রয়েছে।
ডিসেম্বর মাসে সবজি মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক অবদান রাখলেও জানুয়ারিতে তা ইতিবাচক হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাইকারি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফার প্রবণতার কারণে সবজির দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি না বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। জানুয়ারিতে যেখানে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, সেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮.৮ শতাংশের কাছাকাছি নয়, বরং ৮.০৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে প্রকৃত অর্থে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এর ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে চাপে পড়েছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭০.৪৮ শতাংশ রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে এনবিআর।
যদিও ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায় কিছুটা বেড়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে এটি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ২১.১৮ শতাংশ। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েও এডিপি বাস্তবায়নের এই হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ডিসেম্বর মাসে কিছুটা বাড়ার পর জানুয়ারিতে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। জানুয়ারিতে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে।
একই সঙ্গে প্রবাস আয় প্রবাহও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে ঈদ সামনে রেখে প্রবাস আয়ের প্রবাহ আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও অ-পোশাক খাতে রপ্তানি বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্লথ।
অন্যদিকে আমদানির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে আমদানি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাধারণত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এই বিষয়গুলোতে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারলেই অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার করা গেলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যদি সংস্কার বিলম্বিত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা আরো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৮.৫ শতাংশ, জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তিনটি বড় সংস্কার সবচেয়ে জরুরি—কর আদায় জিডিপি ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে এবং আয়করভিত্তিক আধুনিক কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ