ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

‘স্যামসন অপশন’ ইসরায়েলের আত্মঘাতী পণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার


‘স্যামসন অপশন’ ইসরায়েলের আত্মঘাতী পণ

ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না যে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে এটি প্রায় সর্বজনস্বীকৃত যে দেশটির কাছে উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে, যেগুলো বহনের জন্য বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও রয়েছে। এই নীতিকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার অপাসিটি’ বা পারমাণবিক অস্পষ্টতা।

কিছু সংস্থার মতে, ইসরায়েলের কাছে ৯০ থেকে ৪শ’টির মতো ওয়ারহেড থাকতে পারে, যার প্রথমটি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৬ সালের শেষ দিকে বা ১৯৬৭ সালের শুরুতে।

ইসরায়েলের ‘শিমন পেরেস নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র’, যা ডিমোনা প্ল্যান্ট নামে পরিচিত, ফ্রান্সের সহায়তায় নির্মিত হয় এবং ১৯৬২ সালে এটি কার্যকর সক্ষমতার পর্যায়ে পৌঁছায়। এর কয়েক বছরের মধ্যেই ইসরায়েল তাদের প্রথম কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে বলে ধারণা করা হয়।

 

ইসরায়েল তাদের অস্ত্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, আবার সম্পূর্ণ অস্বীকারও করে না। এই অস্পষ্ট অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছে—‘ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে?’

ইসরায়েলের কৌশলগত ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ দ্বারা প্রভাবিত।

তাদের নিরাপত্তা ধারণায় মূল রয়েছে—যদি কোনো যুদ্ধে পরিস্থিতি বিপরীতমুখী হয়, দেশটি ‘ধ্বংসের’ মুখে পড়তে পারে। ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে ইরান, গাজা ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাত, সবকটিকেই ইসরায়েলি নেতারা প্রায়ই ‘জাতীয় টিকে থাকার লড়াই’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রাসঙ্গিকতায় এই মানসিকতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 

সাধারণভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করা।

কিন্তু ইসরায়েলের কৌশলে একটি ভিন্ন মাত্রা রয়েছে, যেখানে কোনো অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র থেকেও যদি দেশটির ‘অস্তিত্ব হুমকির’ মুখে পড়ে বলে মনে হয়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

 

দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের কৌশলগত ব্যবহারের বিশ্লেষণে প্রায়ই ‘স্যামসন অপশন’ নামে একটি ধারণার কথা বলা হয়। অর্থাৎ চরম পরাজয়ের মুখে ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

এই ধারণাটির নাম এসেছে বাইবেলের চরিত্র স্যামসন বা শিমশন থেকে। স্যামসনের গল্প পাওয়া যায় বুক অব জাজে।

তিনি ছিলেন ইসরায়েলের একজন শক্তিশালী নেতা, যার শক্তির উৎস ছিল তার চুল। শত্রুরা তার চুল কেটে দিলে তিনি বন্দি হন। পরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে শক্তি ফিরে পেয়ে তিনি শত্রুরা অবস্থান করা মন্দির ভেঙে ফেলেন, নিজে জীবন দিয়ে বহু শত্রুকে হত্যা করেন।

 

অতীতে কিছু সংঘাতে ইসরায়েল পারমাণবিক হামলার কথা বিবেচনা করেছিল। যেমন, সিক্স-ডে-ওয়ারের সময় মিশরের সিনাই অঞ্চলে পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের চিন্তা করা হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা ব্যবহার করা হয়নি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ব্যাপক ধ্বংস ও বেসামরিক হতাহতের সৃষ্টি করেছে, যা কিছু পর্যবেক্ষকের মতে গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের শুরুতে যে মাত্রার বোমাবর্ষণ হয়েছে, তা বিস্ফোরণ ক্ষমতার দিক থেকে হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি (প্রভাবের দিক থেকে নয়)। এটি দেখায়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসরায়েল কতটা ব্যাপক শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।

মূল প্রশ্নটি হলো, যদি প্রচলিত অস্ত্র দিয়েও তারা এত বড় ধ্বংস করতে পারে, তাহলে যদি ইসরায়েল মনে করে তারা যুদ্ধে হারতে যাচ্ছে, তখন তাদের পদক্ষেপ কী হতে পারে?

একইসঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও ক্রমশ কঠোর অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে। জাতীয়তাবাদী ও সামরিকমনস্ক নীতির প্রতি সমর্থন বাড়ছে, যা ‘অস্তিত্বগত হুমকির’ সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে পরাজয়ের মুখে ইসরায়েল আদৌ চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেবে কি না, এটি এখনো ভীতিকর ও অনিশ্চিত প্রশ্ন।

ইসরায়েল যদি ‘স্যামসন অপশন’ অনুসারে পদক্ষেপ নেয়, তা শুধু ইরান বা ইসরায়েলের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্যও ভয়ঙ্কর হবে।

এই পরিস্থিতি অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য সতর্কবার্তা, যারা ‘পারমাণবিক মহাপ্রলয়’ রোধের দায়িত্বে রয়েছেন। বিশেষ করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।


   আরও সংবাদ