ঢাকা, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

শ্রমঅধিকারের এক ভিন্ন বাস্তবতায় বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১ মে, ২০২৬ ১৭:৩১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৩ বার


 শ্রমঅধিকারের এক ভিন্ন বাস্তবতায় বাংলাদেশ

আজ মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন।

এই দিন এলেই দেশে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনার খই ফোটে। বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।

মালিকপক্ষের অবহেলা ও সস্তা শ্রমের মানসিকতা শ্রমিকের জীবন ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তাজরীন ফ্যাশনস থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপো বা রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়।

এগুলো শিল্প খাতের ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।

 

মে দিবসের বৈশ্বিক ভূমিকা ও বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে দেশের কয়েকজন শ্রমিক নেতার সঙ্গে আলাপ করতে গেলে এমন খেদোক্তি বেরিয়ে আসে তাদের কণ্ঠ থেকে।

 

তারা বলছেন, কাগজে-কলমে দেশে দেশে অনেক শ্রম আইন হলেও শ্রমের প্রকৃত মর্যাদা, জীবনমান উপযোগী মজুরি এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের নতুন আগ্রাসনে শ্রমিকের অধিকার যেন নিত্যনতুন মোড়কে শৃঙ্খলিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বঞ্চনার চিত্র আরও ভয়াবহ ও স্পষ্ট। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্প। এর মধ্যে পোশাক খাত থেকেই আসে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আন্তর্জাতিক চাপে কারখানার ভৌত নিরাপত্তায় কিছুটা উন্নতি হলেও, জীবনমান উপযোগী মজুরির দাবি আজও চরমভাবে উপেক্ষিত। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট এই শ্রমিকরা আজও বাঁচার মতো ন্যূনতম মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন এবং পুলিশের লাঠিচার্জসহ নানা ধরনের দমনপীড়নের মুখে পড়েন।

নির্মাণ শ্রমিকরা চরম ঝুঁকি নিয়ে গগনচুম্বী অট্টালিকা বানালেও নিরাপত্তা সরঞ্জাম, বিমা বা চিকিৎসা কোনো কিছুই ঠিকমতো পান না তারা। গৃহশ্রমিকদের অবস্থা আরও করুণ; তাদের শ্রমের কোনো আইনি স্বীকৃতি বা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টাই নেই, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তো সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়া কৃষিশ্রমিক বা পরিবহন শ্রমিকদের জীবনেরও কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।

কেবল কায়িক শ্রম নয়, ব্যাংক-বিমা কর্মচারী, আইটি খাত কিংবা সংবাদপত্র শিল্পের মতো ‘ভদ্রবেশী’ পেশায়ও শ্রমিকের চরম বঞ্চনা চলছে। সেখানে ৮ ঘণ্টার নিয়ম কেবলই প্রহসন। ছাঁটাই আতঙ্ক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওয়েজবোর্ড বা শ্রম আইন বাস্তবায়ন না করা, নিয়মিত বেতন বকেয়া রাখা এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ সেখানে কর্মীদের অমানবিক ও অস্বাভাবিক জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমান সময়ে শ্রমিক অধিকার হরণের সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আউটসোর্সিং’ বা হালের ‘গিগ ইকোনমি’ প্রথা। হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, রাইড শেয়ারিংয়ের মতো সেবা ও উৎপাদন খাতে আউটসোর্সিংয়ের নামে মালিকপক্ষ কৌশলে শ্রমিকদের ‘কর্মী’ হিসেবে স্বীকৃতিই দিচ্ছে না। থার্ড-পার্টির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে তাদের নিয়োগপত্র, সবেতন ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বা ক্ষতিপূরণের মতো মৌলিক আইনি অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটি কার্যত মে দিবসের মূল চেতনা এবং শ্রমিকের পরিচয়েরই চরম লঙ্ঘন।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বাংলানিউজকে বলেন, প্রায় ১৪০ বছর পরও বাংলাদেশে মে দিবসের ত্যাগের কোনো প্রকৃত প্রতিফলন নেই। এত বছর পেরিয়ে গেলেও মে দিবসের মূল আকাঙ্ক্ষা-আট ঘণ্টা কাজ, ন্যায্য মজুরি ও জীবন বিকাশের সুযোগ-আজও মালিকপক্ষের সীমাহীন লোভ এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার কাছে জিম্মি হয়ে আছে।

তিনি বলেন, দেশে জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বাড়ছে বলে সরকার প্রতিনিয়ত প্রচার করছে, যার নেপথ্যে রয়েছে কোটি কোটি শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত। অথচ দেশে বিদ্যমান ৫৭টি মজুরি বোর্ডের মধ্যে ৪০টিই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে না। মালিকদের কাছে মজুরি মানে এখন কেবল শ্রমিককে আধপেটা খাইয়ে টিকিয়ে রাখা, যাতে সে পরদিন কারখানায় ফিরে উৎপাদন সচল রাখতে পারে। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

তাজরীন ফ্যাশনস থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপো বা রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা মানতে নারাজ এই শ্রমিক নেতা। এগুলোকে শিল্প খাতের ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মাথাপিছু আয় যেখানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা, সেখানে কর্মক্ষেত্রে নিহত একজন শ্রমিকের জীবনের ক্ষতিপূরণ মূল্য ধরা হয় মাত্র ২ লাখ টাকা-যা মানবতার প্রতি চরম উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়।

তিনি জানান, দেশের ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া মাত্র ৫ শতাংশ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠী তাদের ন্যায্য দরকষাকষির অধিকার থেকে আইনিভাবে বঞ্চিত।

বিশ্বজুড়ে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আইনি স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়ে গেছে মনে করেন গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশারেফা মিশু।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, কাগজ-কলমে ৮ ঘণ্টা বলা হলেও বাস্তবে বেঁচে থাকার তাগিদে শ্রমিকদের বাধ্য হয়ে রাত ১০টা-১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত কাজের (ওভারটাইম) হিসেব সঠিকভাবে রাখা হয় না বা মালিকপক্ষ কৌশলে এড়িয়ে যায়।

মোশারেফা মিশু শ্রমিক বঞ্চনার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দিক তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, শ্রমিকদের ওপর এখনো মধ্যযুগীয় কায়দায় শোষণ চালানো হয়। ৪০-৫০ বছর আগে যেমন ১৪-২০ ঘণ্টা কাজ করানো হতো, এখনো অনেক কারখানায় প্রোডাকশন টার্গেটের নামে সেই পরিস্থিতি বিদ্যমান। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের কারিগর এই শ্রমিকদের জীবনমানের তিলমাত্র উন্নতি হয়নি।

বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিকরা অত্যন্ত মানবেতর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘিঞ্জি বস্তিতে বসবাস করেন। চরম পুষ্টিহীনতা এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভোগেন। ৫৪-৫৫ বছর ধরে দেশে বিভিন্ন সরকার আসলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতাপূর্ব আদমজী জুট মিল, বাওয়ানি জুট মিল কিংবা পুরোনো যেসব রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল ছিল, সেখানে শ্রমিকদের জন্য নিজস্ব ডরমিটরি বা কলোনি থাকলেও বর্তমানের ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পগুলোতে শ্রমিকদের আবাসনের কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি, বঞ্চনা আরও বেড়েছে।

২০২৩ সালের শেষদিকে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির যৌক্তিক আন্দোলনে সরকার ও মালিকপক্ষ চরম দমনপীড়নের পথ বেছে নেয়। এরপর সর্বনিম্ন মজুরি মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঘোষণা করা হয়, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, এখনো ঢাকার বাইরের অনেক কারখানায় মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন হয়নি।

বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন এবং সব খাতের জন্য ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ ঘোষণার জোর দাবি জানান মোশারেফা মিশু। নারী শ্রমিকদের প্রতি শারীরিক ও যৌন হয়রানির বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

শ্রমিকনেতারা বলছেন, কারখানায় সুপারভাইজারদের অশালীন অঙ্গভঙ্গি, গালি-গালাজ এবং গায়ে হাত দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। পুরুষ শ্রমিকরাও পান থেকে চুন খসলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তাজরীন ফ্যাশন, রানা প্লাজা বা স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের মতো দুর্ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিক মারা গেলেও মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই মালিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এ সবই মে দিবসের প্রত্যাশার পরিপন্থি।

তারা বলছেন, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তাতে শ্রমিকের ন্যায্য অংশীদারিত্ব থাকে। শ্রমিকের অধিকার ছাড়া মানবাধিকার ও দেশের গণতন্ত্র কখনোই স্থায়ী রূপ পায় না। মে দিবস কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা, র‍্যালি বা ছুটির দিন নয়। এই দিবসকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

দেড় শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে এসেও শ্রমিকের প্রকৃত মুক্তি মিলেনি। কাগজে-কলমে অধিকারের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবসের চেতনা কতটা ধারণ করা সম্ভব হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রথম সারির শ্রম অধিকার কর্মী এবং বিশ্লেষকরা।

রক্তঝরা মে দিবসের ইতিহাস
উনিশ শতকের শেষদিকে শিল্প বিপ্লবের চরম উৎকর্ষের যুগেও শ্রমিকদের জীবন ছিল ক্রীতদাসের মতো। তাদের দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিক পরিশ্রম করতে হতো। এর প্রতিবাদে ১৮৮৪ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলো দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে সোচ্চার হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগোর হে মার্কেট চত্বরে হাজারো শ্রমিক ধর্মঘটে নামেন। সেদিনের প্রধান দাবি ছিল-দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণ; অর্থাৎ 'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদন ও জীবন বিকাশ'।

শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন দমাতে ৩ মে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান। এর প্রতিবাদে ৪ মে হে স্কোয়ারে আয়োজিত বিশাল শ্রমিক সমাবেশে অজ্ঞাত ব্যক্তি কেউ বোমা ছুড়লে এক পুলিশ নিহত হয়। এরপর পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালালে অনেক শ্রমিক শহীদ হন। পরবর্তীতে প্রহসনের বিচারে আগস্ট স্পাইস, অ্যালবার্ট পারসন্সসহ অনেক শীর্ষ শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। শ্রমিক নেতাদের এই আত্মত্যাগের তাৎপর্য ছিল যুগান্তকারী। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে-কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই আন্দোলন শুধু কর্মঘণ্টাই কমায়নি, বরং শ্রমিককে 'মেশিন' বা 'দাস' থেকে 'মানুষ' হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।


   আরও সংবাদ