আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে, ২০২৬ ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬ বার
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে পৌঁছালে তার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ২০০১ সালের ‘গুড-নেইবারলিনেস অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কোঅপারেশন’ চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বুধবার সকালে সম্ভাব্য শি-পুতিন বৈঠকের তাৎপর্য এর চেয়েও অনেক গভীর।
আর এর সময়টিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
পুতিনের সফরের ঘোষণা আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর শেষে বেইজিং ছাড়ার মাত্র একদিন পর।
গত সপ্তাহে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বড় ধরনের বাণিজ্য চুক্তির কথা বললেও, তাইওয়ান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পুতিনের জন্য স্বস্তিদায়ক।
কারণ এতে স্পষ্ট হয়েছে, চীন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে না। অন্যদিকে বেইজিংয়ের জন্যও এটি এক ধরনের কূটনৈতিক শক্তি প্রদর্শন, যেখানে তারা দেখাতে চাইছে, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকেও নিজেদের শর্তে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম চীন।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বেপরোয়া’ মনে করার অভিন্ন অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি ও পুতিন ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছেন। যদিও এবারের সফরে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম, তবু এর সময় নির্বাচনই দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করছে বেইজিং।
শির চেয়ে পুতিনের প্রয়োজন বেশি
চীনের কূটনৈতিক অবস্থান যতই শক্তিশালী হোক, পুতিনের সফর থেকে বড় কোনো নাটকীয় অগ্রগতির প্রত্যাশা করছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং এটি দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখারই ইঙ্গিত।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা গবেষক মারিনা মিরন আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি মনে করি না বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে। বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ব্যবসা, সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়সহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হবে।’
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ রাশিয়া বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত। তারা অংশীদার, কৌশলগত অংশীদার। কিন্তু সামরিক মিত্র নয় এবং আমি মনে করি না সম্পর্ক তার চেয়ে আরও সামনে যাবে।”
তার ভাষায়, ‘রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো নেতিবাচক এজেন্ডা নেই।’
দুই দেশ বিশেষ করে জ্বালানি খাতে যৌথ প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মারিনা মিরনের মতে, চীন কম দামে রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদে প্রবেশাধিকার চায়, অন্যদিকে রাশিয়া ড্রোন উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে চীনের ‘ডুয়াল-ইউজ’ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের প্রয়োজন শির চেয়ে পুতিনের জন্য বেশি। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক টিমোথি অ্যাশ বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের পর রাশিয়া এখন অনেকটাই নির্ভরশীল ও জুনিয়র অংশীদারে পরিণত হয়েছে। পুতিন হয়তো চীনের কাছ থেকে আরও সামরিক সহায়তা চাইতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প যেমন প্রয়োজন নিয়ে বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন, পুতিনও তেমনভাবেই যাচ্ছেন। সব কার্ড এখন চীনের হাতেই।’
তবে ওলেগ ইগনাতভ সম্পর্কটিকে কেবল ‘উর্ধ্বতন-নিম্নতন’ দৃষ্টিতে দেখতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘দুই দেশই বলছে তারা একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ে তুলতে চায়। তারা বিশ্বাস করে না যে কোনো একক শক্তি অন্য দেশগুলোকে জোর করে নিজের ইচ্ছামতো চালাবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে তারা এভাবেই দেখে না।’
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ হওয়ার চেষ্টা
ট্রাম্প ও পুতিনের সফরকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি চীনের বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়া বিশ্বে চীন নিজেকে একটি অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
মারিনা মিরন বলেন, ‘চীন নিজেকে এমন এক মধ্যস্থতাকারী ও নিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যার কোনো শত্রু নেই।’
তিনি আরও বলেন, চীন প্রকাশ্যে কোনো পরাশক্তির সঙ্গে সরাসরি জোটবদ্ধ হতে চাইছে না, যদিও বাস্তবে তারা রাশিয়ার অনেক কাছাকাছি। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের এক ধরনের ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে।
এই সফরের পেছনে বড় প্রেক্ষাপট হয়ে আছে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ। হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব চীনের অর্থনীতিতে রাশিয়ার তুলনায় বেশি পড়ছে।
মারিনা মিরনের মতে, স্বল্পমেয়াদে রাশিয়া কিছুটা লাভবান হচ্ছে, কারণ উপসাগরীয় জ্বালানি প্রতিদ্বন্দ্বীরা চাপে পড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মস্কোও স্থিতিশীলতা চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীন উভয়েই যুদ্ধের অবসান চাইলেও, একই সময়ে তারা ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বজায় রেখেছে।
টিমোথি অ্যাশ বলেন, ‘ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে যুক্তরাষ্ট্র যা চেয়েছিল, চীন তা দেয়নি, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি।’ তার মতে, ‘মস্কো এতে সন্তুষ্ট যে বেইজিং তেহরান বা মস্কো কাউকেই ছেড়ে দিচ্ছে না।’
ইউক্রেন প্রসঙ্গও আসবে আলোচনায়
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হবে। তবে চীন রাশিয়ার ওপর কোনো নির্দিষ্ট সমাধান চাপিয়ে দেবে, এমন সম্ভাবনা কম।
মারিনা মিরন বলেন, ‘ইউক্রেন অবশ্যই আলোচনায় আসবে। চীন শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও মধ্যস্থতার পক্ষে অবস্থান নেবে।’
তবে তিনি যোগ করেন, ‘চীন আবার এটাও চায় না যে, রাশিয়াকে কোনোভাবে অপমানিত হতে হোক। তাই এটিকে কোনো ধরনের আল্টিমেটাম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, সফরটি হয়তো বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি আনবে না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, একদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এবং পরদিন রুশ প্রেসিডেন্টকে আতিথ্য দিয়ে বেইজিং দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে চীনকে উপেক্ষা করা এখন আর সম্ভব নয়।