ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিদায় হজের ভাষণ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২১ মে, ২০২৬ ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার


বিদায় হজের ভাষণ

মহানবী (সা.) তাঁর ৬৩ বছরের জীবদ্দশায় মাত্র একবার হজ করতে পেরেছেন। সেটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম হজ এবং সেটাই সর্বশেষ হজ।

তাই সেটাকে বিদায় হজ বলেও অভিহিত করা হয়।

 

দশম হিজরির শেষ লগ্নে মহানবী (সা.) ঘোষণা দিলেন যে তিনি হজ করতে যাওয়ার ইচ্ছা করেছেন।

সঙ্গে সঙ্গে মদিনাবাসীর মধ্যে তুমুল আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনার জোয়ার সৃষ্টি হলো। সাহাবায়ে কেরাম দলে দলে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে হজ করার মানসে মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন।

 

জিলহজ মাসের ২৫ তারিখে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে হজযাত্রা শুরু করেন। পথ থেকেও অসংখ্য মুসলমান এই মহান হজে যোগদান করেন।

প্রায় সোয়া লাখ সাহাবি সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) জিলহজ মাসের ৫ তারিখে মক্কা শরিফে উপনীত হন। অতঃপর ৯ তারিখ আরাফার ময়দানে বিশাল জনতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ প্রদান করেন।

 

সেটাকেই ‘খুতবাতুল বিদা’ তথা বিদায়ি ভাষণ বলা হয়। ওই ভাষণে তিনি বলেন—
হে আমার প্রিয় সাহাবিরা! আজ যে কথা আমি তোমাদেরকে বলব, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তোমাদের সঙ্গে একত্রে হজ করার সুযোগ আর আমার হবে না।

হে মুসলিম! আঁধার যুগের সব ধ্যান-ধারণাকে ভুলে যাও। নব আলোকে পথ চলতে শেখো।

মনে রেখো, সব মুসলমান ভাই ভাই। কেউ কারো চেয়ে ছোট নও, কারো চেয়ে বড় নও। আল্লাহর চোখে সবাই সমান। নারী জাতির কথা ভুলো না। নারীর ওপর পুরুষের যেরূপ অধিকার আছে, পুরুষের ওপর নারীরও সেরূপ অধিকার আছে। তাদের প্রতি অত্যাচার কোরো না। মনে রেখো, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের গ্রহণ করেছ। সাবধান! ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি কোরো না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু পবিত্র বলে জানবে। যেমনটি পবিত্র এই মাস, এই শহর এবং আজকের এই দিন, ঠিক তেমনি পবিত্র তোমাদের পরস্পরের জীবন, ধন-সম্পদ ও মানমর্যাদা। হে মুসলমানগণ! হুঁশিয়ার, আমিরের আদেশ কখনো লঙ্ঘন কোরো না। যদি কোনো ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমির নিযুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালনা করে, তবে বিনা দ্বিধায় তার আদেশ মেনে চলবে। দাস-দাসীদের সঙ্গে সর্বদা সদ্ব্যবহার কোরো। তাদের ওপর কোনো রূপ অত্যাচার কোরো না। তোমরা যা খাবে তাদেরকে তাই খাওয়াবে, যা পরবে তাই পরাবে। এ কথা ভুলো না যে, তারাও তোমাদের মতো মানুষ।

সাবধান! পৌত্তলিকতার পাপ যেন তোমাদের স্পর্শ না করে। শিরক কোরো না, চুরি কোরো না, মিথ্যা কথা বোলো না, ব্যভিচার কোরো না। সর্বপ্রকার মলিনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে পবিত্রভাবে জীবন যাপন করো। চিরদিন সত্যাশ্রয়ী হও।

মনে রেখো, একদিন তোমাদের আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। সেদিন তোমাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। বংশের গৌরব কোরো না। যে ব্যক্তি নিজ বংশকে হেয় মনে করে, অপর কোনো বংশের নামে আত্মপরিচয় দেয়, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ নেমে আসে। হে আমার উম্মতগণ! আমি যা রেখে যাচ্ছি তোমরা যদি তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, তবে কিছুতেই তোমরা বিভ্রান্ত হবে না। তাঁর রেখে যাওয়া গচ্ছিত সম্পদ হলো, আল্লাহর কোরআন এবং তাঁর রাসুলের সুন্নাহ।

আরো জেনে রেখো, আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। আমিই শেষ নবী। যারা এখানে উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিত সব মুসলমানের কাছে আমার এই সব বাণী পৌঁছে দিয়ো।

অতঃপর তিনি ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে মুখ তুলে আবেগভরে বলতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিতে পারলাম? আমি কি আমার দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারলাম?’ তখন লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই!’ অতঃপর তিনি শাহাদাত আঙুল আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।’ এভাবে তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর খুতবা শেষ করে তিনি নামাজ পড়লেন।

এই হলো আরাফার ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণ। যাতে রয়েছে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এবং অমূল্য পাথেয়। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ওই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: মুসলিম, হাদিস : ১২১৮, সীরাতে ইবনে হিশাম : খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৬০৩-৪, সীরাতে মুস্তাফা : খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৭২, আদর্শ বাংলা পাঠ (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া)

লেখক : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী


   আরও সংবাদ