ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ মে, ২০২৬ ১৭:৫১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২০ বার
রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় শুরু হয়েছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার কেনাবেচা। দেশের অন্যতম কাঁচা চামড়ার পাইকারি বাজার পোস্তায় ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়েছে।
আগের বছরের তুলনায় এবার চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতা ও শঙ্কা কাজ করছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এবছর নানা সংকটের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চামড়া সংগ্রহ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ট্যানারিগুলোর অর্থসংকট, আগের বকেয়া পরিশোধে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়। এজন্য বছর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে।
তবুও ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েকদিন পোস্তা এলাকায় বিপুল পরিমাণ চামড়া কেনাবেচা হবে বলে আশা করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল ৩টার পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে চামড়া আসতে শুরু করে দেশের সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়তটিতে।
আড়তদারদের হাঁকডাক আর শ্রমিকদের ব্যস্ততায় সরব হয়ে ওঠে শায়েস্তা খান রোড, রাজ নারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের সড়কগুলো।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী ও সংগ্রাহকদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে শুরু করেছেন। এখনো পশু কোরবানি পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় পোস্তার বাজারে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হয়নি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চামড়ার আমদানি ও কেনাবেচা আরও বাড়বে।
পোস্তার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি আগেই নেওয়া হয়েছিল। বিকেল ৫টার পর থেকে বাজার জমে ওঠে। গভীর রাত পর্যন্ত চলবে চামড়া কেনাবেচা ও সংগ্রহের কাজ। সংগ্রহ করা চামড়া প্রথমে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেগুলো পাঠানো হবে সাভারের ট্যানারিগুলোতে।
পোস্তার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আফতাব খান বাংলানিউজকে বলেন, এবার পোস্তায় প্রায় এক লাখের মতো কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি রয়েছে। চামড়ার বাজার কেমন যাবে সেটা বোঝা যাবে আজকে বিকেল থেকে। প্রতিবছরই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রির অভিযোগ ওঠে, বিশেষ করে রাতে সংগ্রহ করা চামড়ার ক্ষেত্রে। জবাইয়ের চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ দিতে না পারলে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে। দিনের বেলায় দ্রুত সংরক্ষণ সম্ভব হলেও রাতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। এতে চামড়ার মান কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য দিতে চান না।
কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান বলেন, আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, শুধু কেনার অপেক্ষা। পোস্তায় এখন আর আগের মতো চামড়া আসে না। গুদাম কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় গুদাম ভাড়া নিচ্ছেন। সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু না হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান বলেন, প্রতিবছর কিছু প্রস্তুতি নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়।
গত বছর ২০ শতাংশের বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারও অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে ঝুঁকি রয়েছে। সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
এদিকে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। সারাদেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং সারা দেশে বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে সাভারের ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, পরিবেশগত মান রক্ষা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ফেরাতে শিল্পখাতটিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ চলছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ও কমপ্লায়েন্স সংকটের কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
চামড়া সংগ্রহে ট্যানারিগুলোর প্রস্তুতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, এ বছর দেশে প্রায় এক কোটি পশু কোরবানি হতে পারে। এরমধ্যে প্রতিবছরই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয় নানা কারণে। সে হিসেবে আমরা ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছি।
তিনি বলেন, সরকার এবার লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়িয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের দিন ঢাকায় অধিকাংশ চামড়া লবণ ছাড়া বিক্রি হলেও ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত চামড়া বিক্রি হয়। এবার দরপতনের কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা মূলত ব্যবস্থাপনার বিষয়। বৃষ্টির কারণে চামড়া সংরক্ষণে বাড়তি সতর্কতা দরকার। পশু জবাইয়ের পর দ্রুত চামড়া ছাড়িয়ে সঠিকভাবে লবণ দিতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
চামড়া খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চামড়া শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নীতিগত সমন্বয়, অর্থায়ন সংকট ও আন্তর্জাতিক মান পূরণে ব্যর্থতার কারণে এ খাত এখনো প্রত্যাশিত রপ্তানি আয় দিতে পারছে না। তারপরও কোরবানির ঈদকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে চামড়া শিল্পের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এটি এ বছরের সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এই চামড়ার ৬০ ভাগের বেশি সরবরাহ মেলে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া।