ঢাকা, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বটবাহিনী দেশের জন্য বড় হুমকি

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৫ জুলাই, ২০২৬ ১১:০৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৭ বার


বটবাহিনী দেশের জন্য বড় হুমকি

বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? এর উত্তরে অনেকেই বলবেন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, কেউবা বলবেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। কিন্তু আমাদের সবার অলক্ষ্যে একটি নতুন হুমকি দানা বাঁধছে।

আমরা এ হুমকি অনুভব করছি প্রতি মুহূর্তে, নতুন এ আপদ আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং পারিবারিক জীবনকে করে তুলছে দুর্বিষহ, কিন্তু আমরা এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে পারছি না। আমরা মনে করছি এটাই নিয়তি।

বলছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় বটবাহিনীর কথা।

 

ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতায় বাংলাদেশে গত এক দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ডিজিটাল দুনিয়া এখন শুধু মতপ্রকাশের ক্ষেত্রই নয়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, জনমত নির্মাণ, বাণিজ্যযুদ্ধ-এমনকি চরিত্রহননের এক নতুন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেছেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ।

তিনি বলেছেন, এ বাস্তবতা না বুঝে সাইবার বুলিং বা অনলাইন প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ের অনলাইন ট্রাফিক বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, অনলাইনে মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ও ইন্টারঅ্যাকশনের বড় অংশই প্রকৃত ব্যবহারকারীর নয়। অর্গানিক বনাম নন-অর্গানিক ট্রাফিক আলাদা করতে না পারলে সমস্যার মূল জায়গা চিহ্নিত করা কঠিন।

 

এ বটবাহিনী এখন এতটাই শক্তিশালী যে, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুয়া জনমত তৈরি করছে। যেকোনো স্বনামধন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে তার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। নারীদের অবমাননা করে তাদের জীবন বিপন্ন করছে। এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে এরা তাদের পক্ষে একটা বায়বীয় অনুগত বাহিনী তৈরি করে, যার জনগণ নয় বট বা রোবট।

বট আসলে কী?
বট শব্দটা এসেছে রোবট থেকে। এটি মূলত একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করা হয়। যখন কয়েক হাজার বা লক্ষাধিক ভুয়া প্রোফাইলকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে বলা হয় বট আর্মি বা বটবাহিনী। যেমন, নির্দিষ্ট কাউকে গালি দেওয়া, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বা কারও প্রশংসা করা।

এরা মূলত দুই ধরনের হয়। অটোমেটেড এবং হিউম্যান ট্রল আর্মি। অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বটগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটারচালিত। কোনো নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড দেখলেই এরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমেন্ট করে। যেমন আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দেশের নাম লিখে পোস্ট করেন, তাহলে প্রোগ্রাম করা বটগুলো সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এসে আগে থেকে সেট করা কমেন্ট পেস্ট করে দেবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত বটগুলো আরও ভয়ংকর। এরা শুধু কপি-পেস্ট না করে মানুষের মতো করেই প্রাসঙ্গিক ও আলাদা আলাদা কমেন্ট লিখতে পারে। আর হিউম্যান ট্রল আর্মি আসলে মানুষ, কিন্তু ভুয়া আইডি ব্যবহার করে। এদের টাকা দিয়ে বা রাজনৈতিক উদ্দেশে নিয়োগ দেওয়া হয়। একেকজন মানুষ ১০-২০টি আইডি নিয়ন্ত্রণ করে। আর নির্দেশ পাওয়ামাত্রই কোনো নির্দিষ্ট লিংকে গিয়ে দল বেঁধে আক্রমণ করেন। প্রযুক্তিগতভাবে এরা বট না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এরা বটবাহিনী নামেই বেশি পরিচিত। বটবাহিনী সাধারণত তিনটি কৌশলে কাজ করে। প্রথমত, কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর জনমত কোন দিকে যাবে, তা এরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ কমেন্ট করে এরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে যখন একই ভাষায় গালি বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটাকে সত্যি বলে ভ্রম করতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো পেজ বা আইডি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার রিপোর্ট মারে। ফলে ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমের অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইডিটি ব্লক করে দেয়। মেটা বা ফেসবুকের ভাষায় এ ধরনের কাজকে কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার বলা হয়।

কীভাবে বট চেনা যায়?
বট শনাক্ত করার কিছু পেশাদার উপায় আছে। যেমন, কোনো নিউজ বা পোস্ট পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই যদি ১০০ বা তার বেশি কমেন্ট চলে আসে, তবে বুঝতে হবে এটি বটের কাজ। একজন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পড়ে কমেন্ট করা অসম্ভব। আবার ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের কমেন্ট হুবহু একই হলেও বুঝতে হবে তা বটের কাজ। এ ছাড়া বটদেও আইডিতে সাধারণত কোনো ব্যক্তিগত জীবন বা আসল পরিচয় থাকে না। প্রোফাইল পিকচার হয় কোনো সেলিব্রিটির ছবি, ফুল বা পাখির ছবি। টাইমলাইনে নিজস্ব কোনো পোস্টের বদলে কেবল শেয়ার করা পোস্ট থাকে এবং আইডির ফলোয়ার বা ফ্রেন্ডলিস্টে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

দেশের জন্য হুমকি
বটবাহিনী গণতন্ত্রের জন্য এখন বড় হুমকি। এরা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করতে পারে। সরকারের কোনো ভালো সিদ্ধান্ত এরা পরিকল্পিত ভাবে বিতর্কিত করতে পারে। সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কথা এরা বিকৃত করে প্রচার করে তাকে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন কিংবা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ বাস্তবে এ জনমতের ঢেউয়ের বড় অংশই কৃত্রিম।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে যখন একই ভাষায় গালিগালাজ বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে সেটাকে সত্যি মনে করে। একে অনেক সময় ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধ বলা হয়। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনো দুর্বল হওয়ায় বটনির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে।  এ বটবাহিনীর আসল শক্তি শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন শত শত অভিন্ন মন্তব্য দেখা যায়, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীর মনে এমন ধারণা তৈরি হয় যে এটাই হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় এর নাম ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’; অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মনে হয় এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনমত। বাস্তবে এটি একধরনের ডিজিটাল প্রতারণা। এমনকি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মব তৈরির আগেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে বিতর্কিত বা হত্যাযোগ্য করার কাজটিও বট দিয়ে করা হয়।

বাংলাদেশে বটবাহিনীর দাপট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ কৌশল এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথমে ডিপফেক বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা হয়, পরে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বট ব্যবহার করা হয়। ফলে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে প্রোপাগান্ডা বেশি প্রভাবশালী। এ বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। গণতন্ত্র শুধু ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। হরতাল, সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি কৃত্রিম জনমত তৈরির এ ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। কারণ, এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মেটা, গুগলসহ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশকে এখনই মেটা, গুগলসহ সব সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। তারা যেন বাংলাদেশে অফিস করে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ট্রল ফার্মের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে এ আইন করা দরকার। না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। জনমত প্রাপ্তির উপায় যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার মুখ থুবড়ে পড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি। স্কুল-কলেজ থেকেই তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই, এ দেশে কি জনগণের অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে না কি বটবাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে তথ্য অধিকার।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


   আরও সংবাদ