ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ভারতের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:২১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার


ভারতের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস

বিশ্ব অর্থনীতি যখন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার চাপে, তখন ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা ঝুঁকির মধ্যেও দেশটির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হওয়ায় একের পর এক আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ভারতের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বাড়াচ্ছে।

 

চলতি অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। একই সময়ে ফিচ রেটিংসও তাদের পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।

এর আগে গত সপ্তাহে মুডিসও ভারতের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করে।

 

ভারতের অর্থনীতির এই গতি শুধু রেটিং সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেই প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৭ শতাংশ পূর্বাভাস এবং বাজারের প্রায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

 

তাহলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির ওপর আস্থা বাড়ছে কেন?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ভোগব্যয়, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদন খাত এবং রফতানি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ভারত এককভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।

প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেল ভারতের প্রবৃদ্ধি

ভারতের অর্থনীতির সাম্প্রতিক শক্তিশালী অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বিনিয়োগ, উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করেছে।

এসঅ্যান্ডপি তাদের পূর্বাভাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী শিল্প কার্যক্রম, ভোগব্যয়, পণ্য রফতানি এবং সরকারের বাড়তি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফিচও মনে করছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির অবনতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বাহ্যিক চাপ সত্ত্বেও ভারতীয় অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

মুডিসও ভারতের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সংস্থাটির মতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ভারতের প্রকৃত জিডিপি ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে ব্যক্তিগত ভোগব্যয়, অবকাঠামোয় সরকারি বিনিয়োগ এবং পরিষেবা খাতের শক্তিশালী অবস্থান ভূমিকা রেখেছে।

ভোক্তাদের খরচই বড় ভরসা

ভারতের প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়। এশিয়ার অনেক উৎপাদননির্ভর অর্থনীতির তুলনায় ভারতের প্রবৃদ্ধি রফতানির ওপর কম নির্ভরশীল। ফলে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখছে।

সাম্প্রতিক তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভোগব্যয় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ভারতের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর বাড়তি সক্ষমতা দিচ্ছে।

জ্বালানি ও খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকাও ভোগব্যয় ধরে রাখতে সহায়তা করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে এই পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

বিনিয়োগেও গতি বাড়ছে

ভারতের প্রবৃদ্ধির আরেকটি বড় চালিকাশক্তি এখন বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো খাতে সরকারের মূলধনী ব্যয় অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের বেসরকারি খাতের মূলধনী বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। মোট স্থায়ী মূলধন গঠনও বেড়ে হয়েছে নামমাত্র জিডিপির ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ।

ফিচের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে ভারতে বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। ব্যাংক ঋণ এবং খাদ্যবহির্ভূত ঋণের প্রবৃদ্ধিও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাড়তি গতি তৈরি করছে।

রফতানিও দিচ্ছে বাড়তি শক্তি

ভারতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিতে রফতানিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পণ্য রফতানি বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যও অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।

অর্থাৎ ভারতের বর্তমান প্রবৃদ্ধির কাঠামোটি কয়েকটি খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে-ভোক্তাদের ব্যয়, সরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদন, পরিষেবা ও রফতানি। এ কারণেই কোনো একটি খাতে চাপ তৈরি হলেও পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকছে।

বাহ্যিক ধাক্কা সামলেও স্থিতিশীল ভারত

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ভারতের সামনে ঝুঁকি কম নয়। দেশটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে বলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তারপরও এখন পর্যন্ত এসব ধাক্কায় ভারতের প্রবৃদ্ধির গতি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েনি। মুডিস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে ভারতের অর্থনীতি যে স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে, সেটিই তাদের পূর্বাভাস বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি ঝুঁকির কথাও বলছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। উচ্চ জ্বালানি তেলের দাম মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যের দাম বাড়লে পরিবারের ভোগব্যয়েও চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি কমে গেলে রফতানির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ভারতের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট-বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের শক্ত ভিত্তি দেশটির প্রবৃদ্ধিকে ধরে রেখেছে। এ কারণেই একের পর এক আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াচ্ছে। তবে সামনে তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিই হবে ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা।

সূত্র: এনডিটিভি, রয়টার্স


   আরও সংবাদ