আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:২২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইলেও এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালাতে রাজি হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এতে ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, ট্যাংকার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা বেড়েছে।
সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে গোষ্ঠীটি। এর ফলে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানান।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন তখন সরাসরি সামরিক অভিযানে না যাওয়ার অবস্থান নেয়।
এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, একপর্যায়ে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত করা এবং যুদ্ধবিমানে বোমা তোলার কাজও শুরু হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হুতিদের অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সৌদি সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হুতিরা এখন ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের দিকে এগোচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
তবে সরাসরি বিমান হামলায় সায় না দিলেও সৌদির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ করেনি ওয়াশিংটন। এরই মধ্যে সৌদি আরবের জন্য ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এসব যুদ্ধবিমান হাতে পেতে সৌদির কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথেই যুক্তরাষ্ট্র এগোচ্ছে। একই সময়ে সৌদি আরবের অনুরোধে যুক্তরাজ্য সীমিত সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামূলক আকাশে-আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে।
এদিকে হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমানোর একটি পথও তৈরি হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। হুতি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করবে, তবে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা করবে না। ট্রাম্পও বলেছেন, হুতিরা মার্কিন স্বার্থে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এর ফলে একদিকে সৌদি আরব হুতিদের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ভূমিকা চাইছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে ইয়েমেনে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়ানোর বদলে সীমিত প্রতিরক্ষা সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সৌদি আরব তখন জানায়, ইয়েমেনে অভিযান চালানোর জন্য তারা মার্কিন যুদ্ধবিমানকে নিজেদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তার একটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা থামিয়ে দেন ট্রাম্প।
এদিকে বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা সৌদি আরব আবারও সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির পর দীর্ঘ সময় তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকার পর চলতি বছরের জুলাই থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। নতুন করে সৌদি-হুতি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, হুতিদের সামরিক অগ্রগতি শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নৌবাণিজ্যের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তৈরি হয়েছে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন—ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদির নিরাপত্তা চাহিদা পূরণ করা, নাকি ইয়েমেনে নতুন করে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলা।
সূত্র: রয়টার্স, ফিনান্সিয়াল টাইমস, এনডিটিভি ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস