আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২ বার
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে তারা টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই এ হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, গ্রিনিচ মান সময় সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করা’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সিরিক, আহভাজ ও ইয়াজদ শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বা সেখানে হামলা হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার গভীর রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, হরমুজ প্রণালীতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইনে আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের কয়েকটি সেতুতে আঘাত হানা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত সাতজন নিহত হন।
সেতুগুলো ইরানের প্রধান বন্দর বন্দর আব্বাসে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।
পরে আরও মার্কিন হামলায় ওমান উপসাগরের চাবাহার বন্দরের একটি টাওয়ার ধ্বংস করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা চালাতে আইআরজিসি ওই টাওয়ার ব্যবহার করত। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং ইরানশাহর বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়।
মার্কিন হামলায় জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানায়। মন্ত্রণালয় জানায়, তীব্র গরমের পাশাপাশি বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক কাজে ব্যবহার না হওয়া বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানান, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত নতুন করে চালানো মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
এ হামলাগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই ঘোষণারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে তিনি ইরানের অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও হামলা সম্প্রসারণের কথা বলেছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে ইরানকে চাপ দিতে ট্রাম্প সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিমান হামলা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বর্তমান সংঘাত সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী সমঝোতা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। তবে ইরান প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়েছে এবং বুধবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।
শুক্রবারের হামলার পর আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে যেসব দেশ মার্কিন ঘাঁটি থাকার অনুমতি দিয়েছে, তাদের ‘ভয়াবহ মূল্য’ দিতে হবে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘মার্কিন শত্রু এবং এ অঞ্চলে তাদের ঘাঁটির স্বাগতিক দেশগুলোকে জানতে হবে, লাল রেখা অতিক্রম করে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোতে হামলার মূল্য অত্যন্ত কঠোর ও ধ্বংসাত্মক হবে।’
এর জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, ওমান ও কাতারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একটি কাতার সাম্প্রতিক সংঘাতে এতদিন তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেলেও এবার সেখানেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষে এক শিশু আহত হয়েছে বলে কাতারি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কুয়েতে ইরানি হামলায় একটি বিদ্যুৎ ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ পানীয় জলের উৎস এ ধরনের প্ল্যান্ট। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং দ্রুত চালু করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হতো। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে প্রণালীটি উন্মুক্ত রাখার কথা থাকলেও উভয় পক্ষ এর ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য পৃথক পরিকল্পনা দেয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত পথ ব্যবহারকারী কিছু জাহাজে হামলা চালায়। সাম্প্রতিক সহিংসতায় জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে যেসব জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে, তাদের বেশিরভাগই ইরানের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করছে।
ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা এক সূত্রের বরাতে জানায়, শুক্রবার হরমুজ প্রণালীতে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, কারণ সেটি নাকি বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনীর অনুমতি ছাড়া চলাচলের চেষ্টা করেছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, হরমুজ প্রণালীর খার্গ দ্বীপে নোঙর করা একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, বৃহস্পতিবার ওমান উপসাগরে একটি জাহাজে উঠে তল্লাশি চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে কার্যকর হওয়া ইরানি বন্দর অবরোধের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সেন্টকম আরও জানায়, অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করা তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজকে তারা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এর আগের দিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেওয়া হয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে লোহিত সাগরের তেল পরিবহন পথ বন্ধের প্রস্তুতি নিতে ইয়েমেনের হুথিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। এমনটি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে, তবে দেশটির সব তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সৌদি আরব সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর হুথিরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে সাপ্তাহিক পণ্য পরিবহন প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কিছু তেলবাহী জাহাজ ট্র্যাকিং ডিভাইস বন্ধ রেখে চলাচল করছে, আবার অনেক জাহাজ যাত্রাই স্থগিত রেখেছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন কিছুটা বাড়লেও হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার ঘাটতি পূরণ করার মতো নয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা চলছে, যদিও তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে সংঘাত বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানেও আমরা বড় ধরনের সাফল্য পাচ্ছি। খুব শিগগিরই আপনারা সেই সাফল্যের ফল দেখতে পাবেন।’