স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:০০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩০ বার
আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির পথটা কখনোই মসৃণ ছিল না। শুরুটা হয়েছিল লাল কার্ড আর চোখের জলে, এরপর একের পর এক ফাইনাল হার, তীব্র সমালোচনা এবং জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
শেষটা হয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও আরও নানা সাফল্যে নিজেকে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে। মেসি ও আর্জেন্টিনা যেন একে অন্যের সমার্থক হয়ে উঠেছে, তবে এই জায়গায় পৌঁছাতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন পথ।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকই হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিলমোস ভানচাকের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখেন তরুণ মেসি।
মাঠ ছাড়ার সময় চোখে ছিল জল।
এক বছর পর ২০০৬ বিশ্বকাপে জার্মানিতে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখান তিনি।
সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়ে অংশ নেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা বেঞ্চে বসেই কাটাতে হয়েছিল মেসিকে।
২০০৭ সালে আসে প্রথম বড় ফাইনালের হতাশা। কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। তবে এরই মধ্যে জাতীয় দলের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেন মেসি।
২০১০ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে খেলতে নামেন তিনি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় আর্জেন্টিনা। মেসি গোল করতে পারেননি। শুরু হয় নতুন করে সমালোচনা, সঙ্গে ম্যারাডোনার সঙ্গে তার তুলনাও আরও তীব্র হয়।
২০১১ কোপা আমেরিকাতেও অপেক্ষার অবসান হয়নি। নিজেদের মাটিতে আয়োজিত আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। মেসিকে ঘিরে সমালোচনা তখন চরমে। জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও তৈরি হয় অস্বস্তি।
২০১৪ সালে স্বপ্নপূরণের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছান মেসি। তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে জার্মানির কাছে হেরে যায় তারা। আবারও শিরোপা অধরা থেকে যায়। ম্যারাডোনার মতো দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর স্বপ্নও পূরণ হয়নি।
এরপর ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। এক বছর পর ২০১৬ কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালেও একই প্রতিপক্ষ, একই পরিণতি। এবার টাইব্রেকারে নিজের শট মিস করেন মেসি। পরপর ফাইনাল হার আর হতাশার ভারে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। মাত্র তিনটি শব্দে জানিয়েছিলেন, ‘ইটস ওভার’।
তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফিরে এলেও স্বপ্নপূরণ হয়নি। শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের শিরোপা তখনও মেসির নাগালের বাইরে।
২০১৯ কোপা আমেরিকাতেও হতাশা। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। পুরো টুর্নামেন্টে মেসি একটি গোল করেন এবং আরেকটি গোলে সহায়তা করেন, কিন্তু শিরোপা জেতা হয়নি।
এরপর আসে ২০২১। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। লিওনেল স্কালোনি এমন একটি দল গড়ে তোলেন, যেখানে মেসির পাশে ছিলেন ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেওয়ার মতো একদল ফুটবলার। আর সেই দলের সাফল্যের চূড়ান্ত মুহূর্ত আসে মারাকানায়।
ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় শিরোপা আসে সেই ম্যাচে। কয়েক মাস পর ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমাও জেতে তারা।
এরপর ২০২২ সালে পূর্ণতা পায় মেসির ক্যারিয়ার। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেন তিনি। টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি। বিশ্বকাপ হাতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও মুছে যায়।
দুই বছর পর ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও শিরোপা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আরও একটি আন্তর্জাতিক ট্রফি যোগ করেন মেসি। স্কালোনির দলের সঙ্গে তার বন্ধনও তখন আরও গভীর।
২০২৬ হয়ে ওঠে শেষ অধ্যায়। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দলের হয়ে শেষ যাত্রায় স্পেনের বিপক্ষে লড়াকু এক ফাইনাল খেলেন মেসি। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পর হারতে হয় তার দলকে। পরে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন তিনি।
মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায় তাই শুধুই সাফল্যের গল্প নয়। এটি কান্না, হতাশা, হার, সমালোচনা, অবসর এবং শেষ পর্যন্ত গৌরবের এক দীর্ঘ যাত্রা। অভিষেকের লাল কার্ডে যে গল্প শুরু হয়েছিল চোখের জলে, সেটিই শেষ হয়েছে ট্রফি আর গৌরবের অশ্রুতে।
একসময় যে মেসির জাতীয় দল ছাড়ার দাবি উঠেছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হয়ে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন নির্মম অথচ অনুপ্রেরণাদায়ী প্রত্যাবর্তনের গল্প খুব কমই আছে।