ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:৪২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১০৬ বার
“আইন কি সবার জন্য সমান?”—এই প্রশ্নটি সভ্যতার ইতিহাসে গভীর ও বারবার ফিরে আসা একটি প্রশ্ন। এটির উত্তর কেবল সংবিধানের কলামেই নেই; সত্যিকার পরীক্ষাটা হয় আদালতের মাঠে—নির্বাহী আচরণে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলায়, এবং নৈতিক দায়বদ্ধতায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলে: ‘সকল নাগরিক আইনের সামনে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা লাভের অধিকারী।”এটি কেবল ভাষার অলংকার নয়; রাষ্ট্রের এক মৌলিক অঙ্গীকার।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ICCPR-এর Article 14 ন্যায্য বিচার ও equality of arms-এর স্বীকৃতি দেয়—অর্থাৎ প্রসিকিউশন ও ডিফেন্স-উভয়কেই সমান সুযোগ এবং সমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিচার করতে হবে। একপক্ষকে সুবিধা দিয়ে আরেক পক্ষকে বঞ্চিত করে ন্যায্য বিচার সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-এর নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল নিজেই আদালতের শৃঙ্খলা ও কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করে। নিরাপত্তা, গোপনীয়তা বা অননুমোদিত রেকর্ডিং রুখতে আদালতে মোবাইল নিষিদ্ধ রাখা যৌক্তিক হতে পারে—কিন্তু সেই নিষেধ যদি সবাই-সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না হয়, তখনই সমস্যার শুরু।
ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবীরা মোবাইল খামে জমা দেয়, আর প্রসিকিউশন-পক্ষ নিয়মিত (চিফ প্রসিকিউটর/অন্যান্য প্রসিকিউটর ) কক্ষে ওপেন মোবাইলে কথা বলেন(যেমন ২৫/১/২৬সকাল ১১:২৫–১১:৩০ সময়ে, আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল-১ মোবাইলে কথা বলেন, সিসি রেকর্ডিং দ্বারা প্রমাণিত হবে)—এটি নিয়মিতই ঘটে, তবে এটি কি কোনো সাধারণ শৃঙ্খলাভঙ্গ নাকি এটি প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত!
এ বিষয়ে ডিফেন্স পক্ষের আপিল বিভাগের আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ৪৬ (A) অনুযায়ী শুরুর দিকে এ বিষয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছিলেন, সেটি মাননীয় ট্রাইব্যুনাল মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনপক্ষই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে না,
এমন অবস্থায় মৌখিক নির্দেশ “সবাই মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না” দিলেও বাস্তবে প্রয়োগে যে বৈষম্য দেখা যায়—তাই হলো selective enforcement। এটি ন্যায়বিচারের মূল দর্শনের পরিপন্থী।
দার্শনিকভাবে ভাবলে অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “আইনের শাসন মানে আইনের শাসন—মানুষের নয়।”জন রলসের Justice as Fairness-এ veil of ignorance ধারণা বলে—নীতি এমন হওয়া উচিত যেন আমরা জানি না আগামীকাল আমরা কোন অবস্থায় থাকব। অর্থাৎ নিয়ম-নীতি এমন হওয়া দরকার যাতে তারা সব পক্ষকে সমানভাবে রক্ষা করে। অন্যদিকে লক-রুশোর মতবাদের সারমর্ম হলো—আইনের বৈধতা আসে ন্যায় ও সম্মতি থেকে। আদালত নিজেই যদি অসম আচরণে লিপ্ত হয়, তাহলে জনগণের আস্থাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
নৈতিকতার নিরিখে প্রসিকিউটরের দায়িত্ব বিশেষ—তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ালে রাষ্ট্রের শক্তি ব্যবহার করেন। সেই দায়-দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যদি তিনি আদেশ ভঙ্গ করে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেন, তা ন্যায় নয়—এটি…। বিশেষত ICT-র মতো সংবেদনশীল আদালতে প্রতিটি দৃশ্যমান অসমতা সমগ্র বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে । বিশেষ করে এই ধরণের প্রকাশ্য পক্ষপাত আরও যোগ হলে বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউশন সম্পর্কে ধারণা গভীর সংকটে পড়বে।
বাস্তবে — সবসময় নয়।আদর্শগতভাবে — অবশ্যই হওয়া উচিত।আইনের সামনে সমতা মানে কেবল কাগজে লেখা আইনের থাকা নয়; তা হল সমান প্রয়োগ, সমান আচরণ ও সমান প্রতিষ্ঠানো সংস্কৃতি। যদি আপনার বর্ণিত অবস্থা নিয়মিত ঘটে, তা কেবল ডিফেন্স-পক্ষের সমস্যা নয়—এটি ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বৈধতা এবং দেশের আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
এক্ষেত্রে আদালতের ভেতরে মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট, লিখিত আদেশ জারি করা—যা সব পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।আদেশ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে contempt of court বা অন্য প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা অবলম্বন।বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য —নিয়ন্ত্রিত অডিও/ভিডিও রেকর্ডিং চালু ( যা চালু আছে)করে, যাতে অভিযোগ-প্রমাণ সহজে যাচাইযোগ্য হয়।
শেষ কথা: আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে আইন নিজেই একটি নতুন অন্যায় হয়ে দাঁড়ায়—কারণ এটি জনগণের বিশ্বাস ভেঙে দেয় ও ন্যায়ের পরিবর্তে ক্ষমতার খেলা চালায়। সত্যিকারের ন্যায়বিচারের জন্য আইনকে হতে হবে অন্ধ—পদ, পক্ষ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে।