ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিএনপি সরকারের সামনে ‘অগ্নিপরীক্ষা’

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১০ মার্চ, ২০২৬ ১৩:০১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার


 বিএনপি সরকারের সামনে ‘অগ্নিপরীক্ষা’

বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার প্রভাব আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। এক নজিরবিহীন সংকট যেন ঘনীভূত হচ্ছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশের জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের অপ্রতুলতায় আশঙ্কার মেঘ জমছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই তাদের জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’ বা প্যানিক বায়িংয়ের কারণে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল একটি সরবরাহ সংকট নয়, বরং এটি নবগঠিত সরকারের টিকে থাকা এবং সক্ষমতা প্রমাণের এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।

গত অর্থবছরে দেশে অকটেনের মোট চাহিদা ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার টন, যা দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১০০ টনের মতো। কিন্তু ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাব বলছে, এই চাহিদা বেড়ে ২ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের কারণে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন এক অস্থিরতা তৈরি করেছে যে তারা সক্ষমতার অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রগুলো বারবার বলছে, এই বাড়তি চাহিদার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং সরবরাহ এভাবে চলতে থাকলে দেশের সংরক্ষিত মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। 

 

বিপিসি ইতিমধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য দিনে ২ লিটার এবং প্রাইভেট কারের জন্য ১০ লিটার তেলের যে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা সাময়িকভাবে মজুত রক্ষা করলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাজারে কালোবাজারি এবং তেলের কৃত্রিম সংকটের ঝুঁকি আরও প্রকট হবে।

 

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক ছিল পেট্রল ও অকটেনের দেশীয় উৎপাদন। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, অকটেনের ৫০ শতাংশ এবং পেট্রলের শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে এই উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ‘কনডেনসেট’। বর্তমানে দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার এবং সরকারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) কনডেনসেট শোধন করে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করছে।

কিন্তু যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কনডেনসেট আমদানি ব্যাহত হলে এই দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়বে।

 

বর্তমানে অকটেনের যে মজুত আছে (২৩ হাজার ৫৫ টন), তা দিয়ে দৈনিক ৯১৩ টন সরবরাহের বিপরীতে মাত্র ২৫ দিন চলা সম্ভব। যদিও সরকার এ মাসে আরও ৫০ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার আশা করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই আমদানি পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকারি শোধনাগার থেকে কোনো অকটেন পাওয়া যায় না বলে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা সরকারকে অনেক সময় জিম্মি করে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের পরিবহন, কৃষি এবং বিদ্যুৎ খাতের মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন, যা দৈনিক গড়ে ১২ হাজার টন। তবে সাম্প্রতিক আতঙ্কের কেনাকাটার কারণে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। বিপিসি বর্তমানে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন ডিজেলের মজুত থাকার কথা জানালেও চাহিদার ঊর্ধ্বগতির কারণে তা দিয়ে মাত্র ১৮ দিন চলা সম্ভব হতে পারে।

যদিও ১৩ মার্চের মধ্যে আরও ১ লাখ ৪৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে এই জাহাজগুলোর সময়মতো পৌঁছানো নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেচ মৌসুমে ডিজেলের এই সংকট যদি প্রকট হয়, তবে দেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। ডিজেল সরবরাহ দৈনিক ৯ হাজার লিটারে নামিয়ে আনার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পরিবহন ভাড়াকে উসকে দিয়ে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এরপর ইরানের পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের দামামা বাজছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বর্তমানে প্রায় বন্ধ। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করলেও বর্তমানে তাদের হাতে মজুত আছে মাত্র দেড় লাখ টন। দিনে ৪ হাজার টন শোধন ক্ষমতার বিপরীতে এই মজুত দিয়ে বড়জোর আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতি যেমন চীন, জাপান ও ইউরোপের দেশগুলো এখন জ্বালানি মজুতের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য উচ্চমূল্য দিয়েও দ্রুত জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সরকার খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। আগে যা ১০ ডলারে পাওয়া যেত, এখন তা ২৫ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করছে।

শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের সংকট আরও এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতারের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর পেট্রোবাংলা দিনে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে। এতে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং কলকারখানার উৎপাদনও থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো ডলার সংকট এবং ব্যাংক ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারার কারণে আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে।

অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব নিয়ে জটিলতা থাকায় তারা এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, ফলে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪১ টাকার ১২ কেজি সিলিন্ডার বাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যাংকিং জটিলতা সমাধান করা না গেলে শহর অঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ক্ষোভ সরকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন সঞ্চয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পর সরকার ১১ দফার একটি কঠোর সাশ্রয়ী নির্দেশনা জারি করেছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিসগুলোতে এসি তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির ওপরে রাখা, আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল সাশ্রয়ী নীতি দিয়ে এই বিশাল সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সরকারের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি রোডম্যাপ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়। ঢাকা ও সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নতুন সরকারের জন্য এক নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, বিএনপি সরকারের জন্য এই সংকট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হয় এবং দামের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে তা শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতের বড় ক্ষতি করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আসা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপত্র খোলা সহজ করা এবং দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা জোরদার না করলে পরনির্ভরশীলতা এই সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দেশের সাধারণ মানুষ এখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বর্তমান স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।

এদিকে রোববার (৮ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, সরকার এখনই বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না। তিনি বলেন, ‘দেশে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দুটি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে জ্বালানির ব্যবহার ও মজুত করতে হবে। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে রেশনিং পদ্ধতিতে সাশ্রয়ীভাবে জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন আছে।’

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে চলমান জ্বালানি সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের যে রূপান্তর ঘটছে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বর্তমান সরকারকে অনেক বেশি কৌশলী হতে হবে। মজুত ধরে রাখা এবং সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, প্যানিক বায়িং বন্ধে জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ। অন্যথায়, জ্বালানি সংকটের এই আগুন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে দগ্ধ করতে পারে, যা বিএনপি সরকারের জন্য এক বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


   আরও সংবাদ