ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ন্যায় যখন শুধু রায় নয়, স্বস্তির নাম: এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:৫৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯৪ বার


ন্যায় যখন শুধু রায় নয়, স্বস্তির নাম: এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর

একটি পুরনো গল্প আছে — এক কৃষক তার জমির জন্য বছরের পর বছর আদালতের দরজায় ধরনা দেন। রায় যখন আসে, তখন তিনি বৃদ্ধ, জমি অন্যের হাতে, আর তাঁর চোখে শুধু এক অদ্ভুত শূন্যতা। আইন হয়তো তাঁর পক্ষেই বলেছিল, কিন্তু ন্যায় — সেই গভীর, মানবিক, আত্মার স্বস্তির অনুভূতি — সেটি কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল বছরের পর বছরের প্রতীক্ষায়। এই গল্পটি কেবল একজন কৃষকের নয়, এটি সেই কোটি মানুষের গল্প যারা প্রতিদিন “ন্যায়” খুঁজতে গিয়ে “ব্যবস্থা”র দেওয়ালে মাথা ঠুকে ফেরেন।

সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায় কখনো শুধু আদালতের রায় নয়। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছে ন্যায় মানে মাস শেষে ঠিকমতো মজুরি পাওয়া। একজন ধর্ষণের শিকার নারীর কাছে ন্যায় মানে সমাজের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ফিরে পাওয়া। এই অনুভূতি কোনো আইনের বইয়ের সংজ্ঞায় ধরা যায় না, কিন্তু যে মানুষটি এটি পায়নি, সে ঠিকই বোঝে তার অনুপস্থিতি কতটা ভারী।

বাস্তবতার আয়নায় এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। World Justice Project-এর Rule of Law Index ২০২৩ অনুযায়ী, ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭তম, আর নাগরিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ১৩২তম। Transparency International Bangladesh-এর গবেষণা জানাচ্ছে, নিম্ন আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে কয়েক বছর লেগে যায় এবং তার খরচ একটি দরিদ্র পরিবারের কয়েক মাসের আয়ের সমান হয়ে দাঁড়ায়। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয় — এগুলো হলো হাজারো মানুষের নিঃশব্দ কান্নার হিসাব, যারা ন্যায় চাইতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

বিজ্ঞান বলছে, এই যন্ত্রণা কেবল সামাজিক নয়, এটি আমাদের জৈবিক সত্তার গভীরে প্রোথিত। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, যখন মানুষ পরিবেশকে ন্যায়সঙ্গত মনে করে, তখন তাদের মস্তিষ্কে চাপের হরমোন কমে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। আর যখন সে অন্যায়ের শিকার হয়, তখন হতাশা, ক্রোধ ও বিষণ্নতার এক দুষ্টচক্র তৈরি হয় যা ব্যক্তিকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধু মানুষ নয় — বানরজাতীয় প্রাইমেটদের উপর পরীক্ষায়ও দেখা গেছে, অসম ব্যবহার পেলে তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। এটি প্রমাণ করে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কোনো সভ্যতার আমদানি নয়, এটি আমাদের বিবর্তনের উত্তরাধিকার।

দর্শনের জগতে এই প্রশ্নটি আরও পুরনো। প্লেটো ভাবতেন, ন্যায় হলো আত্মার সামঞ্জস্য — যেখানে যুক্তি আবেগকে পথ দেখায়। অ্যারিস্টটল বলতেন, ন্যায় মানে সমানের সাথে সমান ব্যবহার এবং প্রাপ্য অনুযায়ী বণ্টন। এই দুই মহান চিন্তকের কথা আধুনিক পৃথিবীতে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন অমর্ত্য সেনের কলমে। তাঁর “The Idea of Justice” গ্রন্থে তিনি সংস্কৃতের দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন — নীতি, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন, আর ন্যায়, অর্থাৎ বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন। তিনি বলেন, কেবল সুন্দর আইন লিখলেই হয় না, সেই আইন গরিবের ঘরে কতটা আলো পৌঁছাচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন। জন রলস আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, সত্যিকারের ন্যায্য সমাজ সেটাই যেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ধর্ম এই ধারণাকে আরও গভীর আধ্যাত্মিক মাত্রা দেয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “ন্যায়ের জন্য দাঁড়াও, এমনকি তা যদি নিজের বিরুদ্ধেও হয়” — ইসলামে ন্যায় বা আদল কোনো রাজনৈতিক ধারণা নয়, এটি সরাসরি আল্লাহর গুণের প্রতিফলন। হিন্দু দর্শনে ন্যায় ধর্মের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত — কর্মের নিয়মে প্রতিটি সত্তা তার প্রাপ্য পায়। বৌদ্ধ চিন্তায় ন্যায় হলো করুণা, অহিংসা এবং সকল প্রাণীর সমান মর্যাদার মধ্যে নিহিত এক নিরব সত্য। 
খ্রিস্টধর্মে ন্যায় হলো ঈশ্বরের ভালোবাসার সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ — যা দরিদ্রের পাশে দাঁড়ায়, নির্যাতিতের কণ্ঠ হয়। পৃথিবীর সব বড় ধর্মই এই একটি কথায় একমত: ন্যায় কেবল ব্যক্তির প্রাপ্তির বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডের প্রশ্ন।

সাহিত্য এই সত্যকে গল্পের ভাষায় বলেছে বারবার, অনন্য দক্ষতায়। ভিক্টর হুগোর ‘Les Misérables’-এ জাঁ ভালজাঁ যখন একটুকরো রুটির জন্য উনিশ বছর জেল খাটেন, তখন বোঝা যায় — আইন যদি মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে সে আইন নয়, সে শুধু শক্তির হাতিয়ার। দস্তয়েভস্কির রাসকলনিকভ হত্যাকে যুক্তি দিয়ে ন্যায় প্রমাণ করতে চায়, কিন্তু আত্মা তাকে ক্ষমা করে না — কারণ প্রকৃত ন্যায় কখনো মিথ্যার উপর দাঁড়াতে পারে না। আর বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবের — পদ্মার বুকে জীবন কাটানো সেই মাঝি — প্রশ্ন তোলে, যে মানুষের পেটে ভাত নেই, তার কাছে সত্য-মিথ্যার বিচার কীভাবে দাঁড়ায়? এই সাহিত্যের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে একটাই সত্য: ন্যায় রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়, এটি মানুষের অন্তরের ভাষা।

তাহলে কোথায় দাঁড়াবে সেই গরিব নারী, যিনি বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে খালি হাতে ফেরেন? তিনি যখন বলেন, “বিচার বড়লোকের জন্য, আমাদের ভাগ্যে শুধু অপেক্ষা আর অপমান” — তখন এটি কোনো অভিযোগ নয়, এটি একটি সভ্যতার আত্মসমালোচনা। এই বৃত্ত ভাঙতে হলে কেবল আইন সংশোধনে কাজ হবে না, মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায় পৌঁছে দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সহজ ভাষায় “আইন পাঠশালা” চাই, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে “ন্যায়বিচার সহায়ক ইউনিট” চাই, মোবাইল কোর্ট বা ডিজিটাল হটলাইনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে তার অধিকার তুলে দিতে চাই। ভার্চুয়াল শুনানি আর অনলাইন মামলা দাখিলের সুযোগ বাড়লে সময় যাবে কমে, খরচ যাবে কমে, আর দূরত্ব কমবে বিচার আর বিচারপ্রার্থীর মধ্যে।

কাগজে লেখা সংজ্ঞা যতই মহৎ হোক, জীবনে ন্যায়ের অস্তিত্ব নির্ভর করে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান আর জাগ্রত নাগরিক সমাজের উপর। বিজ্ঞান বলে এটি আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি, দর্শন বলে এটি সমাজের ভিত্তি, ধর্ম বলে এটি ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি, আর সাহিত্য বলে এটি মানুষের সবচেয়ে পুরনো কান্না। সব পথ এসে মেলে একটি বিন্দুতে — ন্যায় তখনই সত্যি হয়, যখন তা গরিবের ঘরে আলো জ্বালায়, শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটায় এবং প্রতিটি মানুষকে তার অক্ষুণ্ণ মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়। ন্যায় শুধু রায় নয় — ন্যায় হলো স্বস্তির নাম, মুক্তির নাম, মানুষ হয়ে বাঁচার নাম।​​​​​​​​​

এম.এ.এ. বাদশাহ্ আলমগীর
Advocate
The Subordinate Courts of Bangladesh
Associated with practice at the High Court
Legal Advisor, Aparadhchokh24.com
Email : badshah.alamgir08@gmail.com


   আরও সংবাদ