ঢাকা, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

খেলনা গ্রামে বৈশাখের প্রাণ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩০ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১ বার


খেলনা গ্রামে বৈশাখের প্রাণ

বগুড়া: নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ এলেই উৎসবের রঙে রাঙিয়ে ওঠে গ্রামবাংলা। মেলা, মানুষের ভিড় আর আনন্দের আবহে কোথাও ভেসে আসে পরিচিত এক ছন্দ-“টম টম টম”।

সেই শব্দের টানেই পৌঁছে যাওয়া যায় বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার ছোট্ট গ্রাম খোলাসে, যা এখন সবার কাছে পরিচিত ‘খেলনা গ্রাম’ হিসেবে।

 

দুপচাঁচিয়া উপজেলা সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য।

প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চলছে খেলনা তৈরির ব্যস্ততা। কেউ বাঁশের কাঠিতে রং দিচ্ছেন, কেউ রোদে শুকাচ্ছেন রঙিন অংশ, আবার কেউ তৈরি করছেন টমটম গাড়ির চাকা।

নারী ও শিশুরা রঙিন কাগজ কেটে আঁকছেন নকশা। পুরো গ্রাম যেন এক জীবন্ত কারখানা।

 

খোলাস গ্রামের প্রধান আকর্ষণ টমটম-মাটির চাকা, বাঁশের কাঠি আর রঙিন কাগজে তৈরি এই খেলনা ঘোরালেই শোনা যায় ছন্দময় শব্দ। এছাড়াও তৈরি হয় পাখি গাড়ি, কাঠের ট্রাকসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খেলনা, যা গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও সৃজনশীলতার প্রতিচ্ছবি।

গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যেখানে নারীরাই মূল কারিগর। তারা খেলনা তৈরি করেন, আর পুরুষরা সেগুলো হাট-বাজার ও মেলায় বিক্রি করেন।
৬৮ বছর বয়সী কারিগর হামিদা বেগম জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। এই খেলনা তৈরি করেই সংসার চালিয়েছেন, এমনকি মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন। তবে পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুবই কম, প্রতিদিন প্রায় ১২শ খেলনা তৈরি করেও ১ হাজার খেলনার জন্য পান মাত্র ৭০ টাকা।

কারিগরদের মতে, একটি খেলনা তৈরি করতে খরচ পড়ে ৭ থেকে ১২ টাকা। পাইকারিতে বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়, আর মেলায় ২৫ থেকে ৫০ টাকায়। তবে আগের মতো বাজার না থাকায় অনেক সময় খেলনা বিক্রি না হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ বলছেন, বছরে মাত্র ছয় মাস কাজ থাকে। অনেক সময় খেলনা বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়, লোকসান হয়।

দুর্গাপূজা থেকে রথযাত্রা পর্যন্তই মূলত এই খেলনা তৈরির মৌসুম। বৈশাখ মাসে চাহিদা বাড়লেও বর্ষা এলেই কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, এই টমটম শিল্পের সূচনা পাকিস্তান আমলে কুড়ানু নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এই ঐতিহ্য। বর্তমানে খোলাস গ্রামের খেলনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে-ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেটেও ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বগুড়ার উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এ. কে. এম মাহফুজুর রহমান জানান, খোলাস গ্রামে এই ধরনের হস্তশিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। কারিগররা আগ্রহী হলে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন শুরু, নতুন স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকে ঘিরেই আবার ঘুরতে শুরু করেছে খোলাস গ্রামের মাটির চাকা। শিশুদের হাসি, মেলার কোলাহল আর টমটমের ছন্দে জেগে ওঠে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। গ্রামীণ মেলার এই ছোট্ট খেলনাই যেন বলে দেয় শেকড়ের টান এখনও আছে, শুধু তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন।


   আরও সংবাদ