ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ মে, ২০২৬ ১০:৫২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার
রাজধানীর হকার ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা চালুর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর-ভ্যাট ও উচ্চ ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করা বৈধ দোকানিদের তুলনায় অল্প খরচে ফুটপাতে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হলে তা অসম প্রতিযোগিতা ও নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নীতিমালা হলেও এর বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
তাঁরা বলছেন, সড়ক ও ফুটপাতের এসব হকারের কাছ থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।
বিশাল এই অর্থ ‘লাইনম্যান’ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্তার পকেটে গেলেও সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে না এক পয়সাও।
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করে, শুধু নিবন্ধন, স্মার্ট কার্ড বা নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
বরং করকাঠামো, নগর ব্যবস্থাপনা, বৈধ ব্যবসার প্রতিযোগিতা ও জনভোগান্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় না আনলে এই নীতিমালা বাস্তবে ‘ফুটপাতের ব্যবসাকে আংশিক বৈধতা দেওয়ার’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
জানা গেছে, বর্তমানে বেশির ভাগ হকার সরকারকে নিয়মিত কর বা ভ্যাট দেন না।
তাঁরা ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অথচ ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যেতে প্রতিদিন বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিতে হয় বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল, লাইনম্যান, রাজনৈতিক কর্মী বা অসাধু কর্মকর্তাদের।
ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং একটি অনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে বৈধ দোকান মালিকদের রাজধানীতে দোকান পরিচালনা করতে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ভাড়া। এর সঙ্গে রয়েছে ট্রেড লাইসেন্স ফি, ভ্যাট-ট্যাক্স, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, কর্মচারী-ব্যয় ও নানা সরকারি নিয়ম-কানুন মানার বাধ্যবাধকতা। এত ব্যয়ের পরও অনেক ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন না। যানজট, ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকান ও ক্রেতা প্রবেশে প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফুটপাতের হকাররা কম খরচে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁরা তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। এতে বৈধ দোকানদাররা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। বিশেষ করে মার্কেটসংলগ্ন ফুটপাতে একই ধরনের পণ্য বিক্রি হলে স্থায়ী দোকান মালিকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। ফলে যাঁরা নিয়ম মেনে কর দিয়ে ব্যবসা করছেন, তাঁরা কার্যত নীতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
মিরপুর শাহ আলী এলাকায় কসমেটিকসের ব্যবসা করেন রেজাউল করীম মাঝি। তিনি বলেন, ‘আমার দোকানভাড়া ১২ হাজার টাকা। বছর শেষে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সের ফি দিতে হয়, মাস শেষে কর্মচারী আর অন্যান্য মিলিয়ে আরো ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ আমাদের মার্কেটের সামনে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের কমপক্ষে প্রতিদিন হাজার টাকার বেশি আয় হয়। এখন মনে হচ্ছে স্থায়ী দোকান রেখে ফুটপাতে নামতে হবে।’
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যবসা দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালিত হলে সেটিকে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনতে হবে। শুধু ‘ফি’ নেওয়া আর ‘স্মার্ট কার্ড’ দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এতে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই, আবার রাজস্বব্যবস্থাও স্পষ্ট হচ্ছে না। তাঁদের মতে, সরকার যদি সত্যিই হকারদের বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনতে চায়, তাহলে আয়, পণ্যের ধরন, অবস্থান ও ব্যবসার পরিধি অনুযায়ী স্বচ্ছ কর ও নিবন্ধন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাতকে পথচারীবান্ধব রাখার বিষয়টিও কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় প্রশ্ন—কেন শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদা হকার নীতিমালা করা হলো? দেশের অন্যান্য মহানগর, জেলা শহর ও পৌর এলাকায় তো একই সমস্যা রয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট বা কুমিল্লাসহ বিভিন্ন শহরে ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত হকার বসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু পুরনো। ফলে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নীতিমালা করলে সারা দেশে একটি বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের হকার নীতিমালা শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে, অথচ দেশের সব নগর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা হওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, ‘প্রথমে সারা দেশের জন্য একটি জাতীয় হকার ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করে পরে ঢাকার বাস্তবতা অনুযায়ী আলাদা ও আরো বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করা যেত। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের দীর্ঘদিনের প্রবণতা, আর ঢাকার বাইরের নগর সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পায় না।’
তিনি বলেন, ‘সরকারকে অনেক সময় আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হয়। ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা আইনগতভাবে বৈধ নয়। তাই যাঁরা প্রকৃত অর্থে হতদরিদ্র, তাঁদের জন্য সরকারের আলাদা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি বা পরিবারভিত্তিক সহায়তা স্কিমের মাধ্যমে তাঁদের সহায়তা করা যেতে পারে। কিন্তু অবৈধ দখলকে পুনর্বাসন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না।’
তাঁর মতে, ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা সব হকারকেই হতদরিদ্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেকে ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন এবং আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানেও পৌঁছেছেন। ফলে সবাইকে একই মানদণ্ডে বিবেচনা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
কর ও ব্যয়ের বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘একজন বৈধ ব্যবসায়ী দোকানভাড়া, ট্রেড লাইসেন্স, কর, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ বহন করছেন। অন্যদিকে আরেকজন খুব সামান্য টাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা নয়।’
নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের (সিটি করপোরেশন-১) উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকায় হকার ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের সংকটে পরিণত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য এই নীতিমালা করা হয়েছে। ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও নগর এলাকায়ও এ ধরনের নীতিমালা সম্প্রসারণ করা হবে।’
হকারদের জন্য নির্ধারিত স্বল্প ফি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো ফি নেওয়া হচ্ছে না। যেটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নেবে সেটি মূলত প্রশাসনিক ব্যয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। হকারদের কিউআর কোডসংবলিত পরিচয়পত্র, লাইসেন্স, নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় সরকারের যে ন্যূনতম খরচ হবে, সেই খরচ সমন্বয়ের জন্যই এই অর্থ নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এখানে সরকারের লাভ করার কোনো চিন্তা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার কোনো ব্যবসা করতে চায় না। হকারদের নিবন্ধনের আওতায় শৃঙ্খলার মধ্যে আনাই মূল উদ্দেশ্য। তাঁদের আইডি কার্ড, লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনায় যে ব্যয় হবে, শুধু সেটুকুই নেওয়া হবে।’ মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘হকার নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য সরকারের লাভ করা নয়। হকাররা এ দেশের নাগরিক। তাঁরা যেন ভালোভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সরকার আপাতত সেই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘হকারদের বড় একটি অংশ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। প্রথম ধাপে তাঁদের পুনর্বাসন ও জীবিকার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সরকার আরো ব্যবস্থাপনা বা কাঠামোগত বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারে।’
দুই সিটির উচ্ছেদ অভিযান ও পুনর্দখল : রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে গত এপ্রিলে দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালায়। এতে গুলিস্তান, মিরপুর-১০, নিউমার্কেটের মতো ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানজট কমে। স্বস্তিতে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। কিন্তু মাত্র সপ্তাহখানেকের ব্যবধানেই এসব ফুটপাত ও সড়ক আবার হকারদের দখলে চলে যায়। অথচ তখনো হকার পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করছিল দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। করা হচ্ছিল হকার তালিকা। এবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নতুন হকার নীতিমালা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা সামনে আসায় জনমনে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া উচিত; আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, এতে ফুটপাত ফের দখলের সংস্কৃতি স্থায়ী রূপ পেতে পারে।
গত কয়েক দিন গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তানে গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাত পুনরায় হকারদের দখলে চলে গেছে। ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে হকাররা পণ্য বিক্রি করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা বলছে, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে সময় লাগবে না। নবাবপুর থেকে পল্টনগামী বেসরকারি চাকরিজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় অনেকটা স্বস্তিতে ছিলাম। এখন দেখি পুরোপুরিভাবে আবার দখল হয়ে গেছে। হকারদের কার্ড দিয়ে একেবারেই যদি বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তাহলে শহরের মানুষগুলোর কী হবে? কিভাবে স্বস্তিতে চলাফেরা করব?’ অন্যদিকে হকাররা বলছেন, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। নিউমার্কেট এলাকার এক হকার বলেন, ‘শুনতেছি ফুটপাতে বইতে দিব। এহনো কোনো কার্ড পাই নাই। এই লাইগ্গা এমনিতেই ব্যবসা করতাছি। কার্ড দিলে লাগলে টাহা দিয়া নিমু।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের নতুন হকার নীতিমালা : নীতিমালায় নিবন্ধনের মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড প্রদান, নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসার সুযোগ, মাসিক বা বার্ষিক ফি নির্ধারণ এবং ‘হলিডে মার্কেট’ ও ‘সন্ধ্যাকালীন মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও মিরপুর-১০ এলাকায় হকারদের বসার সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, ফুটপাতে ব্যবসার জন্য ন্যূনতম পাঁচ ফুট পথচারী চলাচলের জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। মেট্রো রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে হকার বসতে পারবেন না। এ ছাড়া কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত হকারদের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, হকার হতে হলে ন্যূনতম ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। হকার ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কমিটি থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ট্রাফিক, রাজউকের প্রতিনিধিরা থাকবেন। আঞ্চলিক কমিটিতে সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি থাকবেন।
হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি: ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অনুসন্ধান বলছে, রাজধানীর প্রায় পাঁচ লাখ হকারের কাছ থেকে বছরে এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। প্রতি হকারকে গড়ে ১৯২ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। পুলিশ, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এই চাঁদার ভাগ পান। শুধু গুলিস্তানে মাসে ২০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। রাজধানীর গুলিস্তান অর্থাৎ শহীদ আবরার ফাহাদ এভিনিউ, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট, মওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের সড়ক, গুলিস্তান সার্ক ফোয়ারা থেকে হজরত গোলাপ শাহ মাজার, সেখান থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার, সার্ক ফোয়ারা থেকে হানিফ ফ্লাইওভার, আওয়ামী লীগ অফিস কার্যালয়ের সামনের সড়কসহ ভেতরের অলিগলিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার হকার রয়েছেন। এর মধ্যে কাপড়, ফল, খাবারসহ বিভিন্ন আইটেমের দোকান রয়েছে। এসব দোকানের ছোট ও বড় আকার রয়েছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা তোলে লাইনম্যান খ্যাত শক্তিশালী চাঁদাবাজচক্র। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠানো হয়। এ ছাড়া কিছু দোকান থেকে মাসিক ভিত্তিতে পাঁচ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত টাকা আদায় করছে তারা।
চাঁদাবাজ-লাইনম্যান কারা: জানা যায়, শুধু গুলিস্তান এলাকায় ২০ জন লাইনম্যান খ্যাত চাঁদাবাজ রয়েছে। লাইনম্যান খ্যাত এসব চাঁদাবাজের মধ্যে লাইনম্যান নবী রাজধানী হোটেল ও বেল্টের গলি নিয়ন্ত্রণ করেন। গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনের ফুটপাত ও রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করছেন হারুন। এ ছাড়া গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত রজ্জব, লম্বা বাবুল, সেলিম, বিমল, বাচ্চু, খোরশেদ, নিপু, মোহাম্মদ আলী, ওসমানী উদ্যান পূর্ব এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন শাহজাহান। খদ্দর মার্কেটের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন কাদির। স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেট নিয়ন্ত্রণ করেন খলিল ও পুটন। জাসদের অফিসের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন রহিম। কমিউনিস্ট পার্টি অফিসের সামনের এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন কালা নুরু। বেল্টের গলি থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সড়ক ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন আকতার ও জাহাঙ্গীর। জিপিও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন সালাম (দাড়িওয়ালা)। ফুলবাড়িয়া ও বাস টার্মিনাল এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি মোহাম্মদ আলী। রমনা ভবন ও ভাসানী স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন আলী মিয়া। এসব লাইনম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করছেন হকার্স সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এই চিত্র শুধু গুলিস্তানে নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হকারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে শতকোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি করা হয়।
ঢাকার বাইরেও চাঁদাবাজি: চট্টগ্রাম নগরীর ৭১ শতাংশ সড়ক হকারদের দখলে। নগরের ফুটপাতগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, স্থানীয় চাঁদাবাজরা এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং চাঁদা আদায় করে। এর মধ্যে নতুন ব্রিজ এলাকায় লেদু, নিউমার্কেট এলাকায় মামুন, স্টেশন রোড এলাকায় কিবরিয়া, বহদ্দার হাট এলাকায় ফয়সাল এবং আন্দরকিল্লা এলাকায় ইয়াসিনের নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এখানে বিভিন্নভাবে দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা বলেন, ‘আমরা নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করি। প্রতি মাসে অন্তত আমার বিভাগ থেকে ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত এবং সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।’ সিডিএর প্রিপারেশন অব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২০-৪১) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত জরিপের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নগরের ৯৭ শতাংশ রাস্তার একাংশ দখলে রয়েছে।
৬৪ শতাংশ রাস্তায় পথচারী পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। জরিপকৃত সড়কের ৮৩ শতাংশে ফুটপাত আছে। ৭১ শতাংশ ফুটপাত সম্পূর্ণ বা আংশিক বেদখল। ৬৮ শতাংশ ফুটপাতে হাঁটার উপযোগিতা নেই। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা, সাইনবোর্ড, বোর্ডবাজার, বড়বাড়ী, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরের সফিপুর বাজার এবং শহরের জয়দেবপুর লেভেলক্রসিং এলাকায় সড়ক-মহাসড়কের পাশে ফুটপাতে হকাররা বসেন। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এখান থেকে চাঁদা ওঠান।
রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি থেকে রাজশাহী কলেজ, রেলগেট থেকে গণকপাড়া, লক্ষ্মীপুর থেকে রেলগেট, শিরোইল, ভদ্রা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, কোর্ট স্টেশন, শালবাগান, নওদাপাড়া এলাকার বেশির ভাগ ফুটপাত হকারদের দখলে। অনেক জায়গায় ফুটপাতগুলো কার্যত অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক স্থানে পরিণত হয়েছে। এসব দোকান থেকে স্থানীয় চাঁদাবাজচক্র দৈনিক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে।
রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর থেকে কাচারি বাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের ফুটপাতের বেশির ভাগই অবৈধ দখলদারদের দখলে। নগরীর জাহাজ কম্পানির মোড় থেকে কাচারি বাজার পর্যন্ত ফুটপাতে জমজমাট ব্যবসা হয়। রয়েছেন শতাধিক হকার। এঁদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ভাড়ার নামে প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল।
পুনর্বাসনের নামে ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে প্রশ্ন : নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পুনর্বাসনের নামে হকার বসিয়ে ফুটপাত ও রাস্তা দখল বন্ধ করতে হবে। সিটি করপোরেশনের দাবি, এ ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে দোকান বসালে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। দুই সিটি করপোরেশনই দিচ্ছে হকার কার্ড। এরই মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন থেকে প্রায় ৪০০ হকারকে কার্ড দিয়ে বসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সাতটি স্থানকে হকারদের জন্য নির্ধারণ করে সময় বেঁধে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশেন। রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোডে ১০০ হকার পুনর্বাসনে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়েছে তারা। এ ছাড়া গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, বায়তুল মোকাররম পূর্ব গেট সংলগ্ন লিংক রোড, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠসংলগ্ন রাস্তায় প্রতিদিন হকাররা বসতে পারবেন। সন্ধ্যাকালীন বেচাকেনা হবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ, মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের সামনের জায়গায় এবং রাজউক ভবনের পেছনে। উত্তর সিটিতে আপাতত দুটি স্থানে হকার বসবে বলে জানা গেছে। মিরপুর ১০, ১ ও ২ নম্বর সেকশনের মূল সড়কের তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকারের মধ্যে প্রথম ধাপে ২০২ জনকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘কাজ এগোচ্ছে। হকারদের শৃঙ্খলায় আনতে আমরা কাজ করছি। হকারদের বসানোর জন্য যে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, সেটি অস্থায়ীভাবে দেওয়া হচ্ছে। তাই স্থায়ী দখলের কোনো ভয় নেই। তারা কয়েক ঘণ্টার জন্য বসতে পারবে। যখন নীতির আওতায় চলে আসবে, তখন সেই নীতির বাইরে তারা যেতে পারবে না।’
সূত্র: কালের কণ্ঠ