আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জুন, ২০২৬ ১৪:১২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৯ বার
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এতে গত এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে হওয়া নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি আরও চাপে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে সামরিক স্থাপনা, নজরদারি কেন্দ্র ও রাডার সাইট লক্ষ্য করে ‘আত্মরক্ষামূলক হামলার’ একটি নতুন দফা সম্পন্ন করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কয়েক ঘণ্টা আগে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানকে ‘কঠোরভাবে’ আঘাত করবে এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান ‘অত্যন্ত বেশি সময় নিচ্ছে’।
এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলার মুখে পড়ে।
একই সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন কমান্ড সেন্টারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে আইআরজিসি জানায়, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন যুদ্ধবিমান ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। রাজধানী মানামা ও হামাদ সিটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাড়িঘর ও যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী সামান্য আহত হয়েছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ‘শত্রু বিমানীয় লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশটি সাময়িকভাবে আকাশসীমাও বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলরত দুটি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ দাবির কোনো তাৎক্ষণিক স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী সব ধরনের নৌযানের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেন্টকম জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধের খবর এবং তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।
নতুন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘গতকাল আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজও কঠোরভাবে আঘাত করব।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ইরানের নেতারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ‘অত্যধিক দেরি’ করছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানকে সমঝোতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যেকোনো চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে ইরান দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেবে’। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এরপর উভয় পক্ষ মাঝে মধ্যে হামলা চালালেও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন আলোচনা উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং হামলার মাত্রাও বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করে। এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ক্রমেই গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর কারণে যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত ‘আংশিক যুদ্ধবিরতিতে’ পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই সীমিত সংঘাত যে কোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, এ ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সব পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরতে হবে। আর কোনো হামলা নয়, আর কোনো অজুহাত নয়।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি