স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৭ বার
গত মার্চে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার সময় ইরান দল হয়তো ভাবেনি, মূল আসরে অংশ নেওয়াই শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে পারে। একইভাবে দলকে সমর্থন করতে মুখিয়ে থাকা ইরানি সমর্থকরাও হয়তো ভাবেননি, আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথ তাদের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করেন, যার মধ্যে ছিল ইরানও। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ইরান ‘সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক’।
এর ফলে বিশ্বকাপে ইরানের সমর্থকদের উপস্থিতি ঘিরে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানিদের জন্য আরও অপ্রত্যাশিত ছিল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের আয়োজক দেশই টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক মাস আগে তাদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা শুধু ইরানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতেই বাধা দেয়নি, সেটি হয়ে উঠেছে তাদের জন্য বাস্তব ও ব্যক্তিগত বেদনার অংশ। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশজুড়ে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধের অভিঘাত ছুঁয়ে গেছে ইরানের ফুটবলকেও। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আজাদি স্টেডিয়াম, যেখানে স্থানীয় অনেক ম্যাচ হয় এবং জাতীয় দলও অনুশীলন করে। যুদ্ধ শুরুর দিন মিনাবের একটি স্কুলে মার্কিন হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে ছোট ব্যাকপ্যাক হাতে দাঁড়িয়েছিলেন ইরানের ফুটবলাররা।
মাসের পর মাস যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর ইরান দল নিজেদের বেসক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে মেক্সিকোয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সব মিলিয়ে আমির গালেনোয়ির দল বিশ্বকাপে নামবে যুদ্ধের ছায়া মাথায় নিয়েই। তবে তার আগে সময়মতো যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভিসা দেয় কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানি ফুটবল সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এমনিতেই প্রায় অসম্ভব। দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, নেই সরাসরি যাতায়াতের সহজ পথও।
নিরাপত্তাজনিত কারণে পুরো নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া ইরানি সমর্থক আলী বলেন, ‘ভিসা সমস্যার বাইরে, তেহরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে দুই বা তিন ধাপে যাত্রা করতে হয়।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানে ফেরাও বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি। আলী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানে ফেরা নিজেই বড় চ্যালেঞ্জ। ইরান সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।’
যুদ্ধের পর ইরানের ভেতরে রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব নিয়ে নজরদারি আরও বেড়েছে। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাও ঘটেছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ফুটবলেও। ইরানের তারকা ফুটবলার সর্দার আজমুনকে মার্চে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। দুবাইয়ের শাসক মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সঙ্গে বৈঠকের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করাকে সরকারের প্রতি আনুগত্যহীনতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। যুদ্ধের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরান একাধিকবার আমিরাতে হামলা চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার জন্য আমিরাতের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তোলে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রায় ১০০ দিনের কাছাকাছি পৌঁছানোয় শুধু ইরানি নয়, বিশ্বজুড়েই অনেক সমর্থক বিশ্বকাপে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল সমর্থক বাইরন পিল্লে আল জাজিরাকে বলেন, ‘ফুটবলকে সুন্দর খেলা বলা হয় মানুষের মিলনের ক্ষমতার জন্য। কিন্তু মাঠের বাইরের রাজনীতি ও যুদ্ধের ভাষা যখন এত প্রবল, বিশেষ করে আয়োজক দেশগুলোর একটি যখন এর কেন্দ্রে থাকে, তখন সেই জাদুতে বিশ্বাস রাখা কঠিন।’
আরেক দক্ষিণ আফ্রিকান সমর্থক রিয়াজ হামেদও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমেরিকার অবস্থান, বিশেষ করে দেশটিতে সমর্থক ও অভিবাসীদের সঙ্গে আচরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, সেখানে যাওয়া পুরোপুরি নিরাপদ মনে হয় না।’
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনও সমর্থকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, গত বছর নিউ জার্সিতে ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে সন্তানদের নিয়ে যাওয়া এক আশ্রয়প্রার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বিভাগ গ্রেপ্তার করে এবং পরে নিজ দেশে ফেরত পাঠায়।
কেনিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনজীবী খায়রান নূর মনে করেন, খেলাধুলাকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘যদি মাঠের বাইরের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে, তাহলে এসব টুর্নামেন্ট যে অন্তর্ভুক্তির আদর্শের কথা বলে, সেটি কি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় না?’
নূর আরও বলেন, ‘ফুটবল বৈশ্বিক, কিন্তু বৈশ্বিক চলাচলের সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। বিশ্বকাপ সরাসরি এই বৈপরীত্যের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে।’
ভিসা প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সমর্থকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ফিফা টিকিট কেনা সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ ‘ফিফা প্রাইওরিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট শিডিউলিং সিস্টেম’ বা পাস চালু করেছে। এর মাধ্যমে ভিসা সাক্ষাৎকার দ্রুত করা যায়, তবে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
গত মাসে ঘানার প্রায় ১৫০ জন ফুটবল সমর্থকের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। ৩২ বছর বয়সী ঘানার সমর্থক গডউইন নি আরমাহ ব্যক্তিগত কারণে বিশ্বকাপ ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তবে তিনি জানতেন, আবেদন করলে হয়তো তার পরিণতিও ওই সমর্থকদের মতো হতে পারত।
ঘানার ব্ল্যাক স্টার্সকে সমর্থন করতে টরন্টো, বোস্টন ও ফিলাডেলফিয়ায় যাওয়া তার জন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, ভিসা ফি ও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ মিলিয়ে বড় আর্থিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হতো বলেও জানান তিনি।
ঘানার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনে ১৮৫ ডলার এবং কানাডার ভিসার জন্য ১০০ কানাডিয়ান ডলার বা প্রায় ৭১ ডলার দিতে হয়। দুই ভিসার খরচ মিলিয়ে যে অঙ্ক দাঁড়ায়, তা ঘানার গড় মাসিক মাথাপিছু আয়ের কাছাকাছি।
ভবিষ্যতে ফিফার আয়োজক চুক্তিতে প্রবেশগম্যতা ও চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন নূর। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে দল ও সমর্থকদের যদি অংশ নেওয়ার আগেই কাঠামোগত বাধার মুখে পড়তে হয়, তাহলে এসব টুর্নামেন্ট যে অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর চেতনা ধারণ করতে চায়, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।’
তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব আছে। তবে বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজন হয়।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮ দেশের মধ্যে ২৭ দেশের সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা প্রয়োজন। এই ভিসার খরচ ১৮৫ থেকে ৪৩৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশের সাধারণ মানুষের কয়েক মাসের আয়ের সমান।
কানাডা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভিসাবান্ধব হলেও মেক্সিকো সবচেয়ে সহজলভ্য আয়োজক দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছোট একটি সমর্থক দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেক্সিকোর পাচুকায়, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা দল বেসক্যাম্প করেছে এবং গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ খেলবে।
সেই প্রতিনিধি দলের ‘ভাগ্যবান’ কয়েকজনের একজন সাহিল ইব্রাহিম। কেপটাউনে টিভির সামনে বসে দীর্ঘদিন বাফানা বাফানাকে সমর্থন করার পর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মাঠে গিয়ে খেলা দেখেছিলেন তিনি।
এবার ৪০ বছর বয়সী ইব্রাহিম যাচ্ছেন নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে। ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে আয়োজক মেক্সিকোর বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচ তিনি সরাসরি দেখবেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল দল ভিসা জটিলতায় যাত্রা শুরুর আগে ২৪ ঘণ্টা বিলম্বের মুখে পড়লেও ইব্রাহিম জানান, মেক্সিকান দূতাবাসের সঙ্গে দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেশটির ক্রীড়া বিভাগ ‘চমৎকার কাজ’ করেছে।
তবে এই প্রক্রিয়া ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক জটিল বলে মনে করেন তিনি। কাতারে হায়া কার্ডের মাধ্যমে ভিসা, টিকিট ও পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত ছিল।
শুক্রবার, ৫ জুন জ্যামাইকার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রীতি ম্যাচটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে রোববার ইব্রাহিম ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থক দল একটি প্রদর্শনী ম্যাচ দেখবেন, যেখানে ২০১০ বিশ্বকাপের বাফানা কিংবদন্তিরা মুখোমুখি হবেন মেক্সিকোর সাবেক তারকাদের। ২০১০ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, ভিসা, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। খায়রান নূরের কথায়, ‘বড় ক্রীড়া আসরের সাফল্য শুধু মানুষ তা দেখে বলে নয়, মানুষ এতে অংশ নেয় বলেও।’
তিনি যোগ করেন, ‘প্রশ্নটি হলো, কারা বিশ্বকাপ দেখতে পারে, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কারা সত্যিকার অর্থে এতে অংশ নিতে পারে।’