আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ অগাস্ট, ২০২৬ ১২:৩৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৪ বার
জেরুজালেমের পরিচয় এবং শহরটির ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোকে ঘিরে ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে জর্ডানে বৈঠক করেছেন আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
আনাদোলু এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জেরুজালেমবিষয়ক আরব মন্ত্রীপর্যায়ের কমিটির সদস্যরা, আরব লীগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত এবং তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন।
বৈঠকে জেরুজালেমের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, আল-আকসা মসজিদসহ ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর অবস্থা এবং ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
জর্ডানের উদ্বেগ
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি বলেন, জেরুজালেম বর্তমানে অভূতপূর্ব হুমকির মুখে রয়েছে।
তার অভিযোগ, পূর্ব জেরুজালেমে বসতি স্থাপন, ভূমি দখল, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ফিলিস্তিনিদের ওপর বিধিনিষেধ এবং শহরটিকে বাকি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ইসরায়েল শহরটির পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসরায়েল আল-আকসা মসজিদের ইসলামি পরিচয় ক্ষুণ্ন এবং এর দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
পাশাপাশি ইসলামি ও খ্রিস্টান উপাসনালয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে এবং গির্জা ও খ্রিস্টান ধর্মযাজকরাও চাপের মুখে রয়েছেন।
সাফাদির মতে, এসব পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখল আরও শক্তিশালী করা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে দুর্বল করার বৃহত্তর নীতির অংশ।
মিসরের অবস্থান
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জেরুজালেমের আরব, ইসলামি ও খ্রিস্টান পরিচয় পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি শহরটির পবিত্র স্থানগুলোর ওপর জর্ডানের হাশেমি তত্ত্বাবধানের প্রতি কায়রোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরোধিতাও করেন তিনি।
সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান গাজায় ইসরায়েলের চলমান পদক্ষেপের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ এবং পবিত্র স্থানগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য।
তিনি পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব লঙ্ঘন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার বক্তব্য
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আত্তাফ অভিযোগ করেন, ইসরায়েল জেরুজালেমকে ‘ইহুদিকরণ’ এবং শহরটির আরব, ইসলামি ও খ্রিস্টান পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তিনি শহরটি রক্ষায় সমন্বিত আরব ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান।
তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী নাফতি বলেন, জেরুজালেমের পরিচয় ও পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার যৌথ দায়িত্ব। তিনি বসতি সম্প্রসারণ, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং শহরটির ঐতিহাসিক, আইনগত ও জনসংখ্যাগত চরিত্র পরিবর্তনের সব প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।
পাকিস্তানের আহ্বান
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ জেরুজালেমের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম বা এর ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর চরিত্র পরিবর্তনের যেকোনো পদক্ষেপ অকার্যকর ও বাতিল।
এ ছাড়া তিনি অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে জেরুজালেম রক্ষা, বসতি স্থাপন কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান, গাজা শান্তি প্রণালী এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ইরাকের অবস্থান
ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন জেরুজালেমে ইসরায়েলের পদক্ষেপ, আল-আকসা মসজিদে অনুপ্রবেশ, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের নিন্দা জানান।
তিনি শহরটির ঐতিহাসিক ও আইনগত মর্যাদা রক্ষায় আরব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ইরাকের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
আরও পড়ুন
গাজা পরিকল্পনায় মতবিরোধ ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
গাজা পরিকল্পনায় মতবিরোধ ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
জেরুজালেমবিষয়ক আরব মন্ত্রীপর্যায়ের কমিটিতে জর্ডান, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, সোমালিয়া, ইরাক, কাতার, মিসর ও মরক্কো রয়েছে। জেরুজালেমের ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর অভিভাবক হিসেবে জর্ডান এই বৈঠকের আয়োজন করে।
আরও পড়ুন
গাজা দখলে ৩৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিল ইসরায়েল
গাজা দখলে ৩৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিল ইসরায়েল
বৈঠকে অংশ নেওয়া আরব ও মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন দাবি, জেরুজালেমে ইসরায়েলের চলমান পদক্ষেপ শহরটির পরিচয়, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই