ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৬ বার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ছোট্ট শিশুটির নিথর দেহ। পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের আহাজারি আর আশপাশের মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
শিশুটির মৃত্যুর কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, এ কথা জেনে উপস্থিত অনেকে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
তাদের ভাষ্য, প্রশিক্ষণ তো দূরের কথা, অনেক অটোরিকশা চালকের কোনো ধরনের অভিজ্ঞতাই নেই।
রিকশায় ব্যাটারি লাগিয়ে সুইচের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চালানো হয় এই যান। চালক যদি কিশোর বয়সী হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এসব চালকের অনেকে হাতের সংকেত ব্যবহারের নিয়ম কিংবা ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কেও অবগত নয়। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
আর সেই নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কাতেই ঝরে গেল চার বছরের শিশু আদিবার জীবন।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার আলীগঞ্জ এলাকার প্রধান সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় আদিবাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আদিবা কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী থানার গৌরীপুর গ্রামের ট্রাকচালক মো. মোখলেস হোসেনের মেয়ে। আদিবার পরিবার বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় থাকে।
নিহত শিশুর আত্মীয় মো. জুম্মন জানান, বিকেলে বাসার সামনে বড় বোন ফাতিমার সঙ্গে খেলছিল আদিবা। একপর্যায়ে সে হঠাৎ দৌড়ে রাস্তা পার হতে গেলে দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে আদিবা গুরুতর আহত হয়। বড় বোন দ্রুত বাসায় গিয়ে মাকে খবর দিলে তিনি ছুটে এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে চিকিৎসক আদিবাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক অটোরিকশার ধাক্কায় শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়ে বলেন, শুধু ঢাকা শহর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রায়ই অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। প্রায় প্রতিদিনই এমন দুর্ঘটনায় আহত শিশু ও ব্যক্তিরা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে। এছাড়া মৃত্যু তো আছেই।
এর আগে চলতি বছরের ৬ মে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের সিলেটি বাজার ৭ নম্বর গলিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় জান্নাতি (৫) নামের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। বাসার সামনে খেলতে থাকা জান্নাতিকে দ্রুতগতির একটি অটোরিকশা ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সেদিনও পরিবারের অভিযোগ ছিল, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলা অটোরিকশাটি শিশুটিকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
সংসদে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ঢাকা সিটিতে একটি মাল্টি-মোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিতভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে কীভাবে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের ৭১ বিধিতে দেওয়া নোটিশের পর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ঢাকা সিটিসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার বিষয়ে শিগগিরই একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) বলছে, গত জুন মাসে দেশে ৫৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৭৫০ জন। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, তাদের বিভাগীয় অফিসগুলোর মাধ্যমে সারা দেশের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগীয় হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১৭১টি দুর্ঘটনায় ১৪৩ জন নিহত এবং ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। ঢাকা বিভাগে ১১৫টি দুর্ঘটনায় ১০৩ জন নিহত ও ১৭৬ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়া খুলনা বিভাগে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ৮৮ জন আহত হয়েছেন। রাজশাহী বিভাগে ৬৫টি দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ৬৬ জন আহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে ৩৫টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ৭৯ জন আহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে ২১টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। রংপুর বিভাগে ৪৭টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন।
জুন মাসের দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৮২৭টি যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে ছিল মোটরকার বা জিপ ২৭টি, বাস বা মিনিবাস ১৫৩টি, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান ১৭১টি, পিকআপ ৫৫টি, মাইক্রোবাস ১৮টি, অ্যাম্বুলেন্স ৭টি, মোটরসাইকেল ১৩৮টি, ভ্যান ২৩টি, ট্রাক্টর ৬টি, ইজিবাইক ২২টি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ২৭টি, অটোরিকশা ৬২টি এবং ১১৮টি অন্যান্য যানবাহন।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ১২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া মোটরকার বা জিপ দুর্ঘটনায় ১২ জন, বাস বা মিনিবাস দুর্ঘটনায় ৪৫ জন, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান দুর্ঘটনায় ৭১ জন, পিকআপ দুর্ঘটনায় ২৬ জন, মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ৬ জন, অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় ৪ জন, ভ্যান দুর্ঘটনায় ১১ জন, ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় ২ জন, ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ১২ জন, ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় ১৭ জন, অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ৪১ জন ও অন্যান্য যান দুর্ঘটনায় ৯৪ জন নিহত হয়েছেন। সবমিলিয়ে জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬২ জন।